নিজের মেয়ে নেই, তবু ১৫ মেয়ের বাবা সাজ্জাদ পারভেজ

আহমেদ বায়েজিদ, বরিশাল:

প্রকাশ: ২০:২২, ২ নভেম্বর ২০২৬

নিজের মেয়ে নেই, তবু ১৫ মেয়ের বাবা সাজ্জাদ পারভেজ

সন্তান বলতে নিজের ঘরে একটি ছেলে। নেই কোনো কন্যাসন্তান। অথচ জীবনের দীর্ঘ পথচলায় ১৫ জন মেয়ের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন বাবার প্রতিচ্ছবি। কারও বিয়ের আসরে উকিল বাবা, কারও অসুস্থতায় অভিভাবক, কারও সন্তান জন্মের সময় রক্তের জোগানদাতা, আবার কারও সন্তানের কাছে স্নেহময় নানা। সম্পর্কের শুরুটা হয়েছিল একটি বিয়ের দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে। সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক ছড়িয়ে পড়েছে ১৫টি পরিবারের জীবনে। তিনি সাজ্জাদ পারভেজ। পেশাগত দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে যিনি কিছু সুবিধাবঞ্চিত মেয়ের জীবনে তৈরি করেছেন ভালোবাসা ও নিরাপত্তার এক ভিন্ন ঠিকানা। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৬ বছরে ১৫ জন অসহায় ও সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন তিনি। তবে তার মানবিকতার গল্পের সবচেয়ে বড় দিক হলো, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরও মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্কের ইতি টানেননি।

বরং বিয়ের পর তাদের সংসারের খোঁজখবর নেওয়া, স্বামীদের স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা, সন্তান জন্মের সময় পাশে থাকা কিংবা অসুস্থতায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া—সবকিছুতেই নিজের দায়িত্ব মনে করেছেন তিনি।

একটি বিয়ে থেকে ১৫ মেয়ের বাবার পথচলা

সাজ্জাদ পারভেজ দীর্ঘদিন সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে, বর্তমানে সুরক্ষা বঞ্চিত মেয়েদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ।

সেই কর্মজীবনেই পরিচয় হয় এমন কিছু মেয়ের সঙ্গে, যাদের অনেকের জীবনে পরিবার, নিরাপদ আশ্রয় কিংবা সামাজিক স্বীকৃতির অভাব ছিল। সমাজের অবহেলা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠা এসব মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেন তিনি।

ইয়াসমিন ও খালেকের বিয়ের দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। বিয়েতে উকিল বাবার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর একে একে তানজিলা, রহিমা, বৃষ্টি, তামান্না, লামিয়াসহ ১৫ জন মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেন। এসব বিয়ের অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

তবে বিয়ের মঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে উকিল বাবা হওয়ার চেয়ে মেয়েদের জীবনে একজন নির্ভরযোগ্য অভিভাবক হয়ে ওঠাই ছিল তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিয়ের এক যুগ পরও ভোলেননি রিয়াকে

সাজ্জাদ পারভেজের মানবিক সম্পর্কের গভীরতা বোঝা যায় রিয়ার জীবনের একটি ঘটনায়। প্রায় ১২ বছর আগে রিয়ার বিয়ের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে রিয়ার। জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যে একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।

এমন পরিস্থিতিতে রিয়া ছুটে আসেন সেই মানুষটির কাছে, যিনি একসময় তার বিয়ের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। খবর পেয়ে সাজ্জাদ পারভেজও তাকে ফিরিয়ে দেননি। রিয়ার সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেন। শুধু চিকিৎসা ও সুস্থতার বিষয়েই পাশে থাকেননি, তার খাবারের কষ্টের কথা চিন্তা করে এক মাসের বাজারও কিনে দেন।

বিয়ের প্রায় এক যুগ পরও একজন মানুষের প্রতি এমন দায়িত্ববোধ বিরল। স্বামীর সংসার ভেঙে যাওয়ার পরও যে মেয়েটি তার কাছে আশ্রয় ও সহযোগিতা চেয়েছে, তাকে নিজের সন্তানের মতোই আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি।

সন্তান জন্মের রাতেও বাবার দায়িত্ব

সম্প্রতি তানজিলার সন্তান জন্মের সময় জরুরি ভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজন হয়। রাতের বেলা খবর পেয়ে দেরি না করে ছুটে যান সাজ্জাদ পারভেজ। প্রয়োজনীয় রক্তের ব্যবস্থা করে দেন তিনি। একইভাবে লামিয়ার সন্তান জন্মের খবর পেয়েও তাকে দেখতে যান। মেয়েদের সন্তানদেরও নিজের নাতি-নাতনির মতো স্নেহ করেন।

তানজিলার কাছে সাজ্জাদ পারভেজের পরিচয় এখন আর শুধু উকিল বাবা নয়। তিনি বলেন, ‘বিয়ের পরও বাবা আমাদের ছেড়ে দেননি। আমরা কোনো বিপদে পড়লে প্রথমেই যার কথা মনে হয়, তিনি হলেন বাবা। আমার সন্তান হওয়ার সময় রাতে রক্তের প্রয়োজন হয়েছিল। খবর পেয়েই তিনি ছুটে আসেন এবং রক্তের ব্যবস্থা করেন। আমার সন্তানকে তিনি নিজের নাতির মতোই দেখেন। আমাদের কাছে তিনি শুধু উকিল বাবা নন, সত্যিকারের বাবা।’
নিজের মেয়ের অভাব পূরণ হয়েছে ১৫ মেয়ের ভালোবাসায়

নিজের এই ব্যতিক্রমী সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সাজ্জাদ পারভেজ। মেয়েদের প্রসঙ্গ উঠতেই একপর্যায়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমার নিজের একটি মাত্র ছেলে। মেয়ে না থাকার যে অভাব, সেটা এই মেয়েদের মধ্যে পূরণ হয়েছে। ওদের বিয়ের সময় উকিল বাবা হয়েছিলাম। কিন্তু এখন আর শুধু উকিল বাবা মনে করি না। ওরা আমার সন্তান। ওদের কোনো বিপদ হলে নিজের সন্তানের বিপদ মনে হয়।’

কিছুক্ষণ থেমে আবেগ সামলে তিনি আরও বলেন, ‘ওদের কারও বিপদের কথা শুনলে এখনও মনে হয়, আমার নিজের মেয়ের বিপদ হয়েছে। তাই যতটুকু পারি পাশে থাকার চেষ্টা করি। মেয়েদের সন্তানদেরও নিজের নাতি-নাতনির মতো দেখি।’

সম্পর্কের পরিচয় নয়, দায়িত্বই বড়

একসময় যেসব মেয়ের জীবনে স্থায়ী আশ্রয় কিংবা পারিবারিক নিরাপত্তা ছিল না, তাদের অনেকেই আজ নিজেদের সংসার গুছিয়ে নিয়েছেন। কারও ঘরে সন্তান এসেছে, কেউ স্বামী-সন্তান নিয়ে কাটাচ্ছেন পারিবারিক জীবন। তবে জীবনের কঠিন সময়ে তারা এখনো যে মানুষটির কাছে নির্দ্বিধায় ছুটে যান, তিনি সাজ্জাদ পারভেজ।

তার এই উদ্যোগকে শুধু ১৫টি বিয়ের আয়োজন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ বিয়ে দেওয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব, কিন্তু বিয়ের পর বছরের পর বছর সেই মেয়েদের খোঁজ রাখা, বিচ্ছেদের পর অসুস্থ মেয়েকে সহযোগিতা করা কিংবা গভীর রাতে রক্তের প্রয়োজন হলে ছুটে যাওয়া—এসবের জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতা।

সাজ্জাদ পারভেজের গল্পে তাই বাবা হওয়ার সংজ্ঞাটাই যেন নতুনভাবে ধরা দেয়। জন্মের সূত্রে নয়, ভালোবাসা, মমতা ও দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েও যে একজন মানুষ বাবা হয়ে উঠতে পারেন, তার জীবন্ত উদাহরণ তিনি।

নিজের ঘরে কন্যাসন্তান না থাকলেও ১৫ মেয়ের জীবনে তিনি তৈরি করেছেন বাবার এক নিরাপদ ঠিকানা। বিয়ের আসরে শুরু হওয়া সেই সম্পর্ক আজ ছড়িয়ে পড়েছে পরবর্তী প্রজন্মেও। রক্তের বন্ধন না থাকলেও ভালোবাসার বন্ধন যে কখনো কখনো রক্তের সম্পর্ককেও ছাড়িয়ে যেতে পারে, সাজ্জাদ পারভেজের জীবনগল্প তারই এক মানবিক দলিল।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন