’‎আলোর ফেরিওয়ালা’ শিরিনের হাতে রাষ্ট্রপতির জাতীয় যুব পুরস্কার

মোঃ ‎ফরিদ আহমেদ,নেছারাবাদ (পিরোজপুর) 

প্রকাশ: ২১:২৮, ২ নভেম্বর ২০২৬

’‎আলোর ফেরিওয়ালা’ শিরিনের হাতে রাষ্ট্রপতির জাতীয় যুব পুরস্কার

‎​সন্ধ্যা নদীর মায়াবী বাঁকে, কুয়াশায় মোড়ানো পেয়ারা বাগানের সবুজ ছায়া পেরিয়ে নেছারাবাদের মাটি আজ অন্যরকম এক অহংকারে মুখরিত। সমাজসেবা, মানবতা আর ত্যাগের দীর্ঘ দুই দশকের নিরলস সাধনা অবশেষে পেল তার কাঙ্ক্ষিত মুকুট। সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘জাতীয় যুব পুরস্কার-২০২৬’-এ শ্রেষ্ঠ যুব সংগঠক (নারী) বিভাগে জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন পিরোজপুরের নেছারাবাদের কৃতি নারী শিরিন খানম।

‎রোববার (১ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় যুব দিবস-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাত থেকে যখন তিনি পদকটি গ্রহণ করছিলেন, তখন শুধু একটি হাতই নয়, যেন পুরো নেছারাবাদের কোটি মানুষের স্বপ্ন আর আশার ডানাগুলো একসঙ্গে প্রসারিত হয়েছিল।

‎‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক।

‎​​তেতাল্লিশ বছর আগে জন্ম নেওয়া শিরিন খানমের জীবনটা মোটেও ফুলের বিছানা ছিল না। মো. মোজাম্মেল হক ও ফরিদা বেগমের কোল আলো করে জন্ম নেওয়া এই নারী স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হলেও মন সঁপে দিয়েছিলেন আর্তপীড়িত মানুষের সেবায়। ২০০৭ সালে ‘পাইওনিয়ার ইয়ুথ ক্লাবের’ হাত ধরে শুরু হয়েছিল তাঁর সেই মহাযাত্রা। এরপর থেকে নদীর ভাঙন, মানুষের অভাব কিংবা সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি হয়ে উঠেছেন এক অদম্য প্রমিথিউস—যিনি নিজের হাতে আলো জ্বালিয়ে পথ দেখিয়েছেন অন্যদের।

‎​অন্ধকারে হার না মানা একজ লড়াকু প্রহর
‎​নেছারাবাদের প্রত্যন্ত জনপদে যেখানেই বাল্যবিবাহের কালো ছায়া পড়েছে, সেখানেই দুর্গোয়ার মতো প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছেন শিরিন। কুড়ি থেকে পঁচিশ জন কিশোরীর জীবনকে অকালেই ঝরে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছেন তিনি। 
‎
‎ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিয়েছেন বই-খাতা, ফিরিয়ে এনেছেন ক্লাসরুমের চেনা ছন্দে।
‎​শুধু শিক্ষা বিস্তারেই নয়; ইসলামপুর ইউনাইটেড ব্লাড ডোনার ক্লাবের উপদেষ্টা হিসেবে রক্তদান কর্মসূচি, শীতার্তদের গায়ে কম্বল জড়িয়ে দেওয়া, কিংবা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত কোনো নিরূপায় মানুষের চিকিৎসায় পাশে দাঁড়ানো—তাঁর বিরামহীন পদচারণায় মুখরিত ছিল প্রতিটি জনপদ। 
‎
‎ভাঙা সাঁকো মেরামত থেকে শুরু করে যুবসমাজকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে খেলাধুলার আয়োজন; কিংবা পেয়ারা বাগানের আঁকাবাঁকা মেঠোপথে বৃক্ষরোপণের সবুজ আন্দোলন—সব জায়গায় তিনি এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।

‎​পুরস্কার হাতে পাওয়ার পর আবেগে আপ্লুত শিরিন খানম গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করেছেন তাঁর দীর্ঘ পথচলার সাথীদের। তিনি বলেন, "এ স্বীকৃতি শুধু আমার একার নয়, এটি নেছারাবাদের প্রতিটি সাধারণ মানুষের, যারা প্রতিকূলতার মাঝেও আমার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন।"

শিরিন খানমের এই গৌরবোজ্জ্বল অর্জন নেছারাবাদ তথা গোটা দক্ষিণাঞ্চলের আকাশে এক নতুন আশার প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছে। স্রোতের বিপরীতে হেঁটে কীভাবে সমাজকে বদলে দেওয়া যায়, শিরিন খানম তার এক জীবন্ত উপাখ্যান।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন