জাহাঙ্গীর আলম, বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ)
প্রকাশ: ১৭:৩৪, ১২ অক্টোবর ২০২৬
গত ৯ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয় নতুন সার ডিলারদের অনুমোদিত নামের তালিকা ও প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে। প্রকাশিত তালিকায় বাজিতপুর উপজেলার হালিমপুর ইউনিয়নের ‘মেসার্স জাকির হোসেন ট্রেডার্স’ এবং দিলালপুর ইউনিয়নের ‘মেসার্স আয়ুব ট্রেডার্স’-এর নাম রয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন হালিমপুর ইউনিয়নের পশ্চিম কুতুবপুর গ্রামের জাকির হোসেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তিনি হালিমপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি ছিলেন। এ ছাড়া অতীতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন বলেও জানা গেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, হালিমপুর ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের আবেদন ও তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় বুলবুল নামে আরেক আবেদনকারীর আবেদন যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। তাঁদের অভিযোগ, আবেদনকারীদের তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে অনিয়মের মাধ্যমে জাকির হোসেনের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. শাহাদাত হোসেন সেলিম বুলবুলের পক্ষে সুপারিশ করেছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আবেদনপত্র ও দাপ্তরিক নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হালিমপুর বাজারের স্যানিটারি ব্যবসায়ী রুবেল মিয়ার দাবি, হালিমপুর বাজার কিংবা আশপাশের এলাকায় ‘মেসার্স জাকির হোসেন ট্রেডার্স’ নামে কোনো দোকান তাঁর নজরে আসেনি। এ কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম যাচাই করে ডিলারশিপ দেওয়ার প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে, দিলালপুর ইউনিয়নের তাতালচর গ্রামের আয়ুব আলীর মালিকানাধীন ‘মেসার্স আয়ুব ট্রেডার্স’-এর নামও সার ডিলার নিয়োগের তালিকায় রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ছবিতে আয়ুব আলীকে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আফজাল হোসেন এবং দিলালপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া নোবেলের সঙ্গে দেখা যায়। এসব ছবি ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এসব ছবি থেকে আয়ুব আলীর রাজনৈতিক পদ-পদবি বা দলীয় পরিচয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হালিমপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক হাজী কাজল ভূঁইয়া বলেন, “এ ঘটনার সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। বাজিতপুর উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি অফিস যাচাই-বাছাই করেই তালিকায় আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি জাকির হোসেনের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাহলে এর দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।”
নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিগত সরকারের আমলে বিএনপির মনোনীত ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েও আমি চার বছর বাড়িতে ফিরতে পারিনি। হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় আমাকে হয়রানি করা হয়েছে। ঢাকায় বসেই আমাকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। আমার নেতাকর্মীরা হালিমপুর বাজারের চায়ের দোকানে বসে টেলিভিশন পর্যন্ত দেখতে পারেননি। অথচ আজ আওয়ামী লীগের সাবেক নেতার নাম সরকারি সার ডিলারশিপের তালিকায় এসেছে। এ ঘটনায় প্রশাসনের যাঁরা জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও কিশোরগঞ্জ জেলা যুবদলের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট শাহ-আলম বলেন, “ফ্যাসিস্ট সরকারের হাত থেকে দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে বিএনপির লাখ লাখ নেতাকর্মী মামলা, হামলা, গুম ও খুনের শিকার হয়েছেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে হাজারো মানুষের জীবনের বিনিময়ে দেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকারের কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে সার সরবরাহ কর্মসূচির ডিলারশিপের তালিকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নাম দেখে আমরা হতবাক।”
তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রশাসনের কিছু লোক জড়িত বলে আমরা মনে করি। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই পরিকল্পিতভাবে যথাযথ তদন্ত ছাড়াই এসব করা হচ্ছে বলে আমাদের সন্দেহ। বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে জাকির হোসেন বলেন, “আমি আওয়ামী লীগ করেছি, কিন্তু আমার কোনো পদ-পদবি ছিল না। আওয়ামী লীগ থেকে হালিমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন চেয়েছিলাম, তবে আমাকে দেওয়া হয়নি। ডিলারশিপটি মূলত আমার নয়, এটি ইউনিয়ন বিএনপির বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবিরের। তাঁর কাগজপত্র না থাকায় আমার কাগজ দিয়ে আবেদন করেছি। হালিমপুর বাজারে দোকান না থাকলেও ইন্দুরদাই বাজার ও নিজ এলাকায় আমার দোকান আছে। আমি ১০ বছর ধরে সারের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।”
অন্যদিকে, মেসার্স আয়ুব ট্রেডার্সের মালিক আয়ুব আলী বলেন, “আমি দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে সরকারি সব নিয়মকানুন মেনে ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে ব্যবসা করে আসছি। ব্যবসার সুবাদে বিগত দিনে অনেকের সঙ্গে আমার ছবি রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগে আমার কোনো পদ-পদবি নেই। কেউ যদি প্রমাণ করতে পারেন যে আওয়ামী লীগে আমার কোনো পদ ছিল, তাহলে আমি ব্যবসা ছেড়ে দেব।”
বাজিতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আশরাফুল আলমের কাছে সার ডিলার নিয়োগের তালিকায় জাকির হোসেনের নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
বাজিতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জালাল উদ্দিন মুঠোফোনে বলেন, “বিষয়টি কৃষি কর্মকর্তা ভালো বলতে পারবেন। তদন্তের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য দেওয়া হলে হয়তো এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক বলেন, “অভিযোগটি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতার দাবি, সরকারি সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের যোগ্যতা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব অস্তিত্ব এবং নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।