রিসোর্টে আগুন: ১০ জনের মরদেহ হস্তান্তর, মিলল নিখোঁজ মুক্তার কঙ্কাল

রিয়াজ উদ্দিন, কক্সবাজার

প্রকাশ: ১৮:৩৭, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৮:৪১, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

রিসোর্টে আগুন: ১০ জনের মরদেহ হস্তান্তর, মিলল নিখোঁজ মুক্তার কঙ্কাল

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ১০ দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে নিখোঁজ স্কুলশিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তার বলে ধারণা করা একটি মানবকঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে রিসোর্টের তিনতলার একটি কক্ষের শৌচাগারের পাশ থেকে কঙ্কালটি উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের সদস্যরা। তবে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরই এটি মুক্তার কি না, তা চূড়ান্তভাবে বলা যাবে।

এর আগে একই অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়। মঙ্গলবার তাঁদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিহতদের পাঁচটি পরিবারকে দাফন-কাফনের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে মোট আড়াই লাখ টাকা সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এদিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, সম্ভাব্য গাফিলতি ও দায়ীদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।

গত ১৭ অক্টোবর সকালে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকায় অবস্থিত তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এ ঘটনায় ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হলেও নিখোঁজের তালিকায় ছিলেন ১১ জন। তাঁদের মধ্যে একমাত্র নিখোঁজ ছিলেন সাভারের আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তা। ছুটি কাটাতে দুই বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে এসেছিলেন তিনি।

অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের ডিএনএ পরীক্ষা করে পরিচয় শনাক্ত করা হলেও মুক্তার নমুনার সঙ্গে সেগুলোর কোনো মিল পাওয়া যায়নি। এরপর মঙ্গলবার সকালে রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপে আবারও তল্লাশি শুরু করে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত দল। বিকেলে তিনতলার একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত কক্ষের শৌচাগারের পাশ থেকে পুড়ে যাওয়া মানবকঙ্কালটি উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, এটি মুক্তার দেহাবশেষ হতে পারে। উদ্ধার করা কঙ্কালের পরিচয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।

রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সোমবার পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর মঙ্গলবার তাঁদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। নিহতদের মধ্যে ঢাকার শ্যামলীর গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন (৩৬) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৯) ও মুনাইনা ইহানা (৬) রয়েছেন।

অন্য পরিবারের নিহত ছয় সদস্য হলেন মৌলিতা মেহজাবিন আলভি (১৯), লায়লা জাহান নাবিলা (২৫), ইসরাত জাহান মালিহা (২৭), ফারিয়া কবির (৩৩), ফারিয়ার ছয় বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ফাইজান নূর এবং তাঁর ভাই মোহাম্মদ নাফিস তেহামি (২৪)। তাঁরা ঢাকার বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।

মরদেহগুলো দগ্ধ হয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। প্রাথমিকভাবে পরীক্ষার ফল পেতে তিন থেকে চার সপ্তাহ লাগতে পারে বলে ধারণা করা হলেও জেলা পুলিশ, সিআইডি ও সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগারের সদস্যদের প্রচেষ্টায় দ্রুত ফল পাওয়া যায়।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), কক্সবাজার জেলার বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ জানান, নিহতদের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া মানবকঙ্কালের পরিচয়ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ আবদুল মান্নান জানান, অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের দাফন-কাফনের জন্য সরকারি বিধান অনুযায়ী পাঁচটি পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে মোট আড়াই লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত ও নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডে পরিবারের ছয় সদস্যকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন এক স্বজন। নিহতদের মধ্যে তাঁর স্ত্রী ফারিয়া কবিরসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা রয়েছেন। তিনি জানান, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। সে অনুযায়ী শুক্রবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে গোল্ডেন লাইন পরিবহনে চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পরদিন সকালে তাঁর মামা-শ্বশুর ফোন করে দ্রুত ফিরে আসতে বলেন। খবর পেয়ে ফিরে এসে জানতে পারেন, পরিবারের ছয় সদস্য আর বেঁচে নেই। স্বজনদের হারানোর শোক মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর কক্সবাজারের হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মালিক ও প্রতিনিধিদের নিয়ে সভা করেছে জেলা প্রশাসন। শনিবার অনুষ্ঠিত সভায় চার শতাধিক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। জেলা প্রশাসক মোঃ আবদুল মান্নান বলেন, প্রচলিত আইন ও বিধিমালা মেনে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং অগ্নিনিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। অনুমোদন ও নির্মাণবিধি না মেনে ভবন নির্মাণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতি থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলা নিয়ে নিহতদের পরিবারের আপত্তি ও আইনি সহযোগিতা চাওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনায় কোনো ধরনের গাফিলতি হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টের মালিক মোহাম্মদ তানভীর সুলতান মিয়াকে প্রধান আসামি করে ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রধান আসামি তানভীর সুলতান মিয়া ও অপর মালিক নেওয়াজ মোর্শেদ পলাতক রয়েছেন। রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

১০ জনের মরদেহ হস্তান্তর এবং নিখোঁজ মুক্তার বলে ধারণা করা কঙ্কাল উদ্ধারের মধ্য দিয়ে ঘটনাটির তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া কঙ্কালের পরিচয় নিশ্চিত করা, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে এখনো তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন নিহতদের স্বজনেরা।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন