আলমগীর হোসেন ফয়সাল, লক্ষ্মীপুর
প্রকাশ: ১৮:১০, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীতে মা ইলিশের প্রজনন রক্ষায় টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে আবারও মাছ ধরতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেরা। দীর্ঘ বিরতিতে নদীতে মাছ ধরতে না পারায় অনেক জেলে পরিবারকে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। কারও সঞ্চয় ভেঙে, কারও ধারদেনায়, আবার কেউ আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতা নিয়ে পার করেছেন নিষেধাজ্ঞার দিনগুলো। এখন নিষেধাজ্ঞা শেষে নতুন করে আশার আলো দেখছেন তাঁরা।
নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশসহ নির্ধারিত প্রজাতির মাছ ধরা বন্ধ থাকায় নদীতীরবর্তী জেলে পরিবারগুলোর নিয়মিত আয় বন্ধ হয়ে যায়। মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল এসব পরিবারের দৈনন্দিন খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যেসব জেলে প্রতিদিন মাছ ধরে বিক্রি করে সংসার চালান, তাঁদের জন্য এ সময়টি ছিল বাড়তি চাপের।
অনেক জেলে নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প কাজের সন্ধান করেছেন। কেউ দিনমজুরি, কেউ কৃষিকাজ, আবার কেউ ছোটখাটো শ্রমের কাজ করে সংসারের খরচ জোগানোর চেষ্টা করেছেন। তবে সবার পক্ষে বিকল্প কাজ পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক পরিবারকে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে খরচ কমিয়ে চলতে হয়েছে। কারও কারও ধারদেনাও বেড়েছে।
এদিকে নিষেধাজ্ঞার সময় জাল মেরামত, নৌকা সংস্কার এবং মাছ ধরার সরঞ্জাম প্রস্তুত করেছেন জেলেরা। দীর্ঘদিন মাছ ধরতে না পারলেও নিষেধাজ্ঞা শেষে ভালো ইলিশ পাওয়ার প্রত্যাশায় তাঁরা নতুন করে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁদের আশা, নদীতে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া গেলে আগের আর্থিক সংকট কিছুটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
মেঘনা নদী লক্ষ্মীপুরের বহু জেলে পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস। মাছ ধরা বন্ধ থাকলে শুধু জেলেরাই নন, এর সঙ্গে যুক্ত আড়তদার, মাছ ব্যবসায়ী, বরফকলের শ্রমিক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও প্রভাবিত হন। ফলে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়ে নদীকেন্দ্রিক স্থানীয় অর্থনীতিতেও।
তবে মা ইলিশের প্রজনন রক্ষায় এই নিষেধাজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল জেলেরাই পাবেন। তাই সাময়িক কষ্ট হলেও দেশের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় আইন মেনে চলার গুরুত্ব রয়েছে।
জেলেদের জীবনযাত্রার এই সংকট মোকাবিলায় নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকারি খাদ্যসহায়তা ও অন্যান্য সহযোগিতা যথাসময়ে প্রকৃত জেলেদের কাছে পৌঁছানো জরুরি। পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে তাঁদের আর্থিক চাপ কমবে। জেলে পরিচয়পত্রের তালিকা হালনাগাদ এবং সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “মা ইলিশের প্রজনন ও বংশবিস্তার রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে সবাইকে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।”
নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেদের প্রত্যাশা, মেঘনা নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ ধরা পড়বে এবং তাঁরা ন্যায্যমূল্যে মাছ বিক্রি করতে পারবেন। দীর্ঘ ২২ দিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান তাঁরা। এখন তাঁদের চোখ নদীর দিকে—ইলিশের প্রাচুর্যই পারে সংসারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে।
মা ইলিশ রক্ষার উদ্যোগ সফল করতে যেমন আইন মানা জরুরি, তেমনি নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলে পরিবারগুলোর জীবিকা সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জেলেদের জীবনমান উন্নয়নের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই দুই লক্ষ্য পূরণ করতে।