আহমেদ বায়েজিদ, বরিশাল:
প্রকাশ: ১৮:২০, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
নদীর বুকে যাদের জন্ম, নদীর জলেই যাদের বেড়ে ওঠা, জীবনসংগ্রামও যাদের নদীকে ঘিরে–মৃত্যুর পর তাদের শেষ ঠিকানা নিয়েও ছিল অনিশ্চয়তা। কবরস্থানের অভাবে স্বজনের মরদেহ দাফন করতে না পারার দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে বরিশালের মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষকে। দীর্ঘদিনের এই মানবিক সংকট নিরসনে এবার উদ্যোগ নিয়েছে বরিশাল সদর উপজেলা প্রশাসন।
বরিশাল সদর উপজেলার লাহারহাট, চরবাড়িয়া ও আশপাশের নদ-নদীতে নৌকায় বসবাসকারী মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এ অঞ্চলে বসবাস করছেন। নদীকেন্দ্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই জনগোষ্ঠীর কাছে জীবিকা ও বাসস্থানের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি মৃত্যুর পর মরদেহ দাফনের জায়গা খুঁজে পাওয়াও ছিল বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। স্থানীয়ভাবে কবরস্থানের অভাবে কখনো কখনো মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার মতো হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার কথাও জানা গেছে।
এই সংকট নিরসনে বরিশাল সদর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সহযোগিতায় সিংহেরকাঠী আশ্রয়ণ প্রকল্পসংলগ্ন একটি খাসজমিতে কবরস্থান স্থাপনের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। প্রায় এক একর জমিতে গড়ে তোলা এই কবরস্থান মান্তা সম্প্রদায়ের পাশাপাশি ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষের দাফনের জন্যও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফরিদা সুলতানা প্রস্তাবিত কবরস্থানটি সরেজমিন পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি কাজের অগ্রগতি ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কবরস্থানটি উদ্বোধনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কাজ চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই এটি ব্যবহারের উপযোগী করা সম্ভব হবে।
ইউএনও ফরিদা সুলতানা বলেন, “মান্তা সম্প্রদায়সহ সমাজের পিছিয়ে পড়া ও ছিন্নমূল মানুষেরও সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার এবং মৃত্যুর পর মর্যাদার সঙ্গে শেষ বিদায় পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কবরস্থানের অভাবে কোনো পরিবার যেন স্বজনের মরদেহ দাফন করতে গিয়ে দুর্ভোগে না পড়ে, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন প্রান্তিক মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর সহযোগিতা কামনা করছি।”
মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য এই উদ্যোগ শুধু একটি কবরস্থান প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির একটি প্রত্যাশা। জীবদ্দশায় নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করা এই জনগোষ্ঠীর মানুষ যেন মৃত্যুর পর অন্তত সম্মানজনকভাবে শেষ বিদায় পান, সেই সুযোগ তৈরির পথ খুলছে এ উদ্যোগের মাধ্যমে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণ ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কবরস্থানটি দ্রুত বাস্তবায়িত হলে মান্তা সম্প্রদায়সহ এলাকার অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষের দীর্ঘদিনের একটি বড় সংকটের সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।