ভোটার তালিকা বিতর্কে দিল্লিতে বিক্ষোভ, ৭০০ জন আটক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩:১৭, ২ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২৩:১৯, ২ অক্টোবর ২০২৬

ভোটার তালিকা বিতর্কে দিল্লিতে বিক্ষোভ, ৭০০ জন আটক

ভোটার তালিকা থেকে গণহারে বাদ দেওয়ার অভিযোগে ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দিল্লিতে বিক্ষোভ হয়েছে। ওই বিক্ষোভ ঘিরে শুক্রবার (২ অক্টোবর) কঠোর নিরাপত্তার বলয়ে ঢেকে দেওয়া হয় নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর এলাকা।

বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট পরিষেবা, যা স্থানীয় সময় রাত ৯টা পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। বিক্ষোভ ঠেকাতে ১১টি মেট্রো স্টেশনে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ রাখা হয়েছে, জারি করা হয়েছে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৬৩ ধারা।
পাশাপাশি যন্তর মন্তরমুখী সড়কগুলোতে মোতায়েন করা হয় হাজার হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য।

দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, জনপথ, প্যাটেল চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, রাজীব চক, সেবা তীর্থ, মন্ডি হাউস, লোক কল্যাণ মার্গ, আইএনএ, চাঁদনি চক, রামকৃষ্ণ আশ্রম মার্গ ও নয়াদিল্লি-এই ১১টি স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখা হয়েছে।

তবে কয়েকটি স্টেশনে আন্তঃসংযোগের সুবিধা চালু রয়েছে।

যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় একাধিক স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়েছে।

দিল্লি পুলিশের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ও র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, দিল্লির নিউ দিল্লি জেলায় প্রায় ৫ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।

বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়ার কথা জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ। এর মধ্যেই আম আদমি পার্টির দিল্লি সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজসহ কয়েকজন নেতাকর্মী যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাদের আটক করা হয়। এছাড়া এএপি নেতা অতিশী ও সঞ্জীব ঝাকেও আটক করার খবর পাওয়া গেছে।

সৌরভ ভরদ্বাজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পরও তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ অবশ্য জানিয়েছে, অনুমতি না থাকায় বিক্ষোভ ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পিটিআইয়ের বরাতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকা থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৭০০ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরাও রয়েছেন।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এসআইআরের আওতায় ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে।

তবে নির্বাচন কমিশন এসব নিয়ে ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা প্রশ্নের পর কমিশন তাদের ভোটার-তালিকা ব্যবস্থার সফটওয়্যার পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া আইন মেনেই পরিচালিত হচ্ছে এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

এই বিতর্কের জেরেই বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠন জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, এসআইআর বাতিল এবং ভোটপ্রক্রিয়া নিয়ে আরও স্বচ্ছতার দাবিতে আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়েছে। এদিকে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপিও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে।

দিল্লিতে শুক্রবারের কর্মসূচিতে আম আদমি পার্টির পাশাপাশি ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বা আইসা এবং অন্যান্য সংগঠনের কর্মী-সমর্থকদেরও অংশ নেওয়ার কথা ছিল। পুলিশের বাধার কারণে অনেকে যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে পারেননি।

এদিকে মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কেও শুক্রবার বিক্ষোভের কর্মসূচি দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে জানিয়েছেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। মুম্বাই পুলিশ অবশ্য ওই কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি।

অনুমতি না পাওয়ার পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে দিপকে ‘জেল ভরো’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন। তার দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাব না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করছেন, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ায় ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন বলছে, সংশোধনের লক্ষ্য হলো অনুপযুক্ত বা ভুল নাম বাদ দেওয়া এবং প্রক্রিয়াটিতে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তারা অস্বীকার করেছে।

ইন্ডিয়া জোটও ২ থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে। বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচির মধ্যে ৬ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন ঘেরাও এবং দেশের অন্তত পাঁচটি বড় শহরে জনসভা আয়োজনের কথা রয়েছে। দিল্লিতে বড় সমাবেশের কর্মসূচি ১ নভেম্বর করার কথা জানানো হয়েছে।

ফলে ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। শুক্রবার দিল্লি ও মুম্বাইয়ের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সেই উত্তেজনারই প্রতিফলন।

তথ্যসূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন