সদরপুরে বৃদ্ধা মাকে জঙ্গলে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ মেয়ের বিরুদ্ধে

ফরিদপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১০:১২, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সদরপুরে বৃদ্ধা মাকে জঙ্গলে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ মেয়ের বিরুদ্ধে

ফরিদপুরের সদরপুরে জেলেকা বেগম (৭৫) নামের এক অসুস্থ ও চলাফেরায় অক্ষম বৃদ্ধাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে জঙ্গলে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বড় মেয়ে ময়না বেগমের বিরুদ্ধে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে মাটিতে পড়ে কাঁদছিলেন ওই বৃদ্ধা। শরীরে ময়লা কাপড়, মাথার নিচে প্লাস্টিকের বস্তা, চারপাশে মলমূত্র ও পোকামাকড়ের উপদ্রব—এমন অমানবিক পরিবেশে দিন কাটছে তাঁর। ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্ব শ্যামপুর গ্রামে বৃদ্ধা জেলেকা বেগমকে ওই অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয়রা। তাঁর অভিযোগ, গত ১০ অক্টোবর রাতে বড় মেয়ে ময়না বেগম তাঁকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন এবং পরে জঙ্গলে ফেলে রাখেন।

স্থানীয়দের কাছে জেলেকা বেগম অভিযোগ করেন, মেয়ের বাড়িতে তাঁকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। পাঁচ দিন আগে তাঁকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এ সময় গলা চেপে ধরা ও লাঠি দিয়ে পেটানোর অভিযোগও করেন তিনি।

জেলেকা বেগমের স্বামী অনেক আগেই মারা গেছেন। তাঁর কোনো ছেলে নেই, রয়েছে তিন মেয়ে। বড় মেয়ে ময়না বেগম (৪৮) স্বামী ও এক ছেলেমেয়েকে নিয়ে একই গ্রামে বসবাস করেন। মেজ মেয়ে মনি আক্তার (৩৫) সৌদি আরবে থাকেন। ছোট মেয়ে সীমা আক্তার (৩০) আগে সৌদি আরবে থাকলেও বর্তমানে দেশে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে জেলেকা বেগম বড় মেয়ের বাড়িতেই থাকতেন।

প্রতিবেশীদের ভাষ্য, ছোট দুই মেয়ের বিদেশ থেকে পাঠানো টাকায় ময়না বেগমের বাড়িতে পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। সেখানে বৃদ্ধা মায়ের থাকার কথা থাকলেও তাঁকে রাখা হয়নি। বরং তিনি থাকতেন পুরোনো ও জরাজীর্ণ একটি ঘরে। ওই ঘরে আলো ও বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

প্রতিবেশী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘বৃদ্ধা যেভাবে জঙ্গলে পড়ে আছেন, তাতে যেকোনো সময় শিয়াল-কুকুরের আক্রমণের শিকার হতে পারেন। সাপ-বিচ্ছুরও ভয় রয়েছে। রাতের অন্ধকারে মাটির ওপর একা পড়ে থাকেন তিনি। এভাবে একজন মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকবেন?’

আরেক প্রতিবেশী তোফাজ্জেলের অভিযোগ, জেলেকা বেগমকে নিয়মিত খাবার দেওয়া হতো না। কখনো শুধু লবণ দিয়ে ভাত দেওয়া হতো, পানিও ঠিকমতো দেওয়া হতো না। যে পাত্রে তাঁকে খাবার দেওয়া হতো, সেই পাত্রে কুকুর-বিড়ালও খেত বলে দাবি করেন তিনি।

তবে মায়ের প্রতি অবহেলা ও নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ময়না বেগম। তাঁর দাবি, তাঁর মা নিজেই ঘর থেকে বের হয়ে যান এবং ঘরে থাকতে চান না। তিনি বলেন, ‘আমি তাঁকে মারধর করি না। তাঁর থাকার ঘরটিও আমরা সাধ্য অনুযায়ী পরিষ্কার রাখতাম। প্রতিদিন সম্ভব না হলেও সপ্তাহে এক-দুই দিন তাঁকে গোসল করানো হতো।’

ময়না বেগমের কিশোর ছেলে মাসুমের ভাষ্য, তাঁদের সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে। নিজেদের খাওয়া-দাওয়াই ঠিকমতো চলে না। এর মধ্যেও তাঁরা নানির দেখাশোনা করেন। তাঁর অভিযোগ, নানির অন্য দুই মেয়ে একবারের জন্যও খোঁজ নিতে আসেননি এবং কোনো খরচও দেন না।

এ বিষয়ে সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ শাওন বলেন, সাংবাদিকদের মাধ্যমে তিনি বিষয়টি জানতে পেরেছেন। বৃদ্ধার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাঁকে সহায়তা করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অসুস্থ ও অসহায় এই বৃদ্ধার এমন দুরবস্থার ঘটনায় তাঁর নিরাপত্তা, চিকিৎসা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি বৃদ্ধার মানবিক মর্যাদা ও বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন