বাহুবলে ১০ ফুট দূরত্বে মসজিদ-মন্দির, সম্প্রীতির বন্ধনে দুই সম্প্রদায়

নাজমুল ইসলাম হৃদয়,হবিগঞ্জ

প্রকাশ: ১৩:৪৫, ২০ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৩:৪৯, ২০ অক্টোবর ২০২৬

বাহুবলে ১০ ফুট দূরত্বে মসজিদ-মন্দির, সম্প্রীতির বন্ধনে দুই সম্প্রদায়

এক পাশে মসজিদ, অন্য পাশে মন্দির। মাঝখানে দূরত্ব মাত্র ১০ ফুট। দুটি উপাসনালয়ের প্রবেশদ্বার মুখোমুখি। একদিকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি, অন্যদিকে চলে পূজার্চনা। অথচ নেই কোনো বিরোধ, নেই সাম্প্রদায়িক বিভেদ। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও ভালোবাসার বন্ধনে দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি চলছে দুই ধর্মের মানুষের ধর্মীয় কার্যক্রম।

পূজা উপলক্ষে রং করা হয় মসজিদের সীমানাপ্রাচীর, আবার ঈদে রং করা হয় মন্দিরের সীমানাপ্রাচীর। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এমন অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া বাজার এলাকার কামাইছড়া চা বাগান জামে মসজিদ ও দুর্গামন্দির।

ঢাকা-সিলেট পুরোনো মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এ দুটি উপাসনালয়কে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজ করছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কামাইছড়া দুর্গামন্দির। এর ১৯ বছর পর, ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কামাইছড়া চা বাগান জামে মসজিদ। বর্তমানে মাত্র ১০ ফুট ব্যবধানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা এই দুই উপাসনালয় দুই সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্গামন্দির প্রতিষ্ঠার পরবর্তী সময়ে স্থানীয় মুসল্লি, ব্যবসায়ী ও চা বাগানের মুসলমানদের উদ্যোগে মন্দিরের পাশে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে আসছেন। সময়ের পরিবর্তনে দুই উপাসনালয়ের কার্যক্রম বিস্তৃত হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার সম্পর্ক অটুট রয়েছে।

দুই উপাসনালয়ের মধ্যে দূরত্ব কম হলেও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনায় কখনো বড় ধরনের বিরোধ সৃষ্টি হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বরং ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের সময় একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতি ও উপাসনার প্রতি সম্মান দেখিয়ে চলেন তাঁরা।

দুর্গাপূজার সময় নামাজ ও আজানের মুহূর্তে পূজা উদযাপন কমিটির সদস্যরা নিজেদের ধর্মীয় কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখেন। নামাজ শেষ হলে আবারও শুরু হয় পূজার কার্যক্রম। একইভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনও পূজার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন।

শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রেই নয়, পারস্পরিক সহযোগিতার এমন দৃষ্টান্ত দেখা যায় উপাসনালয় দুটির সৌন্দর্যবর্ধনেও। দুর্গাপূজা উপলক্ষে মসজিদের সীমানাপ্রাচীর রং করে দেন মন্দিরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আবার ঈদ উপলক্ষে মন্দিরের সীমানাপ্রাচীর রং করে দেন মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে এই সহযোগিতার চর্চা দীর্ঘদিনের আন্তরিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করেছে।

এ ব্যাপারে কামাইছড়া চা বাগান জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমাদের কামাইছড়া চা বাগান জামে মসজিদ ও দুর্গামন্দির একেবারে পাশাপাশি অবস্থিত। দুটির দরজাও বরাবর। প্রায় ৫০ বছর ধরে আমরা পূজা কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছি। আমাদের মধ্যে কোনো দিন কোনো বিরোধ সৃষ্টি হয়নি। কামাইছড়ার মসজিদ ও মন্দিরের এই সম্প্রীতি সারাদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরা উচিত।’

অন্যদিকে কামাইছড়া দুর্গামন্দিরের পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি গোপাল গোয়ালা বলেন, ‘আমরা হিন্দু-মুসলিম সব সময় মিলেমিশে থাকি। আমাদের এখানে কোনো দিন কোনো সমস্যা হয়নি। একে অপরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে সম্মান করি এবং সহযোগিতা করি। আশা করি, ভবিষ্যতেও এই সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য অটুট থাকবে।’

তিনি আরও জানান, পূজা উপলক্ষে মসজিদের সীমানাপ্রাচীর রং করে দেওয়া হয়। একইভাবে ঈদের সময় মন্দিরের সীমানাপ্রাচীরও রং করে দেওয়া হয়। এভাবেই দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সহযোগিতা ও আন্তরিকতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

এ বিষয়ে বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উজ্জ্বল রায় বলেন, ‘কামাইছড়ায় দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে মসজিদ ও মন্দির পাশাপাশি অবস্থান করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন করেছে। একদিকে মুসলমানরা নামাজ আদায় করছেন, ঠিক উল্টো পাশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাঁদের পূজা করছেন। আমার মনে হয়, এটি আবহমানকাল থেকে চলে আসা মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। আমি আশা করি, কামাইছড়ার এই দৃষ্টান্ত বাহুবল তথা সারাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আদর্শ হিসেবে গণ্য হবে।’

এছাড়াও কামাইছড়া পুলিশ ক্যাম্পের এএসআই মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, এখানকার মানুষের মধ্যে সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। দুই সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ ধর্মীয় কার্যক্রম পালন করে আসছেন।

বর্তমান সময়ে ধর্মীয় সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে বাহুবলের কামাইছড়ার এই চিত্র এক ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এখানে ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়নি। বরং একে অপরের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, বিপরীতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং পারস্পরিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থান।

মাত্র ১০ ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদ ও মন্দির যেন প্রমাণ করছে, ধর্মীয় উপাসনালয়ের দেয়াল পাশাপাশি থাকলে বিরোধ তৈরি হওয়া অনিবার্য নয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ থাকলে ভিন্ন ধর্মের মানুষও দীর্ঘদিন শান্তিপূর্ণভাবে একসঙ্গে বসবাস করতে পারেন।

কামাইছড়ার এই সম্প্রীতি কেবল বাহুবল কিংবা হবিগঞ্জের নয়; এটি গোটা দেশের মানুষের জন্য একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। ধর্ম যার যার, কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবতা ও সৌহার্দ্য সবার—কামাইছড়ার মসজিদ ও মন্দির পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যেন সেই বার্তাই ছড়িয়ে দিচ্ছে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন