আরিফুল ইসলাম, জয়পুরহাট
প্রকাশ: ২০:২৬, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
ঢোলের তালে তালে ঘুরছে লাঠি, মুহূর্তেই বদলে যাচ্ছে খেলার কৌশল। কখনো আক্রমণ, কখনো প্রতিরোধ—লাঠিয়ালদের নিপুণ কসরতে মুগ্ধ দর্শক। সময় বদলেছে, বদলেছে গ্রামবাংলার জীবনযাত্রা। তবু জয়পুরহাটের ক্ষেতলালের পশ্চিম দেওগ্রামে আজও টিকে আছে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো লাঠিখেলার ঐতিহ্য।
প্রতিবছর দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর তিন দিন পর মামুদপুর ইউনিয়নের পশ্চিম দেওগ্রামে বসে এ মেলা। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামে মেলাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় উৎসবের পরিবেশ। স্থানীয়দের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ আসেন লাঠিখেলা দেখতে।
মেলাটির বিশেষত্ব শুধু লাঠির লড়াইয়ে নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ জীবনের নানা অনুষঙ্গ। আত্মীয়স্বজনকে বাড়িতে দাওয়াত দেওয়া, জামাই-মেয়ের আগমন আর বিশেষ খাবারের আয়োজন—সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে পারিবারিক পুনর্মিলনের উপলক্ষ। মেলাপ্রাঙ্গণে পাওয়া যাচ্ছে শাহী জিলাপি ও নানা ধরনের মিষ্টি। পাশাপাশি রয়েছে বাঁশ-কাঠ, লোহা ও মাটির তৈরি জিনিসপত্র, শিশুদের খেলনা এবং প্রসাধনীর দোকান।
তবে মেলার প্রাণ সেই লাঠিয়ালরা, যাঁরা পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া কৌশল এখনো ধরে রেখেছেন। প্রবীণ লাঠিয়াল সহিদুল ইসলাম জানান, তাঁদের কাছে লাঠিখেলা কেবল বিনোদন নয়, এটি বংশপরম্পরায় পাওয়া এক ঐতিহ্য। বিনা পারিশ্রমিকে তাঁরা খেলায় অংশ নেন, দর্শকদের আনন্দ দেন। কিন্তু নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ তাঁদের ভাবিয়ে তুলছে।
সহিদুল ইসলামের ভাষ্য, আগের মতো নতুন খেলোয়াড় তৈরি না হলে এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই লাঠিখেলার প্রতি তরুণদের আগ্রহ বাড়ানো জরুরি।
মেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি আব্দুল কাদের বলেন, পশ্চিম দেওগ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের উদ্যোগেই এই আয়োজন চালিয়ে আসছেন। তাঁর মতে, লাঠিখেলা শুধু একটি খেলা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এলাকার ঐতিহ্য ও মানুষের আবেগ। এই আয়োজন টিকিয়ে রাখতে আরও মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
গ্রামবাংলার অনেক লোকজ খেলা যখন হারিয়ে যাওয়ার পথে, তখন পশ্চিম দেওগ্রামের এই মেলা হয়ে উঠেছে ঐতিহ্য ধরে রাখার এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তবে প্রায় দুই শতাব্দীর এই ধারাকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে নিয়মিত চর্চা, নতুন খেলোয়াড় তৈরি এবং পৃষ্ঠপোষকতা এখন সময়ের দাবি।