সীমান্ত সিরাজ
প্রকাশ: ২০:৩২, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
সাভারে বায়ুদূষণ রোধ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ভোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। বক্তারা বলেছেন, বায়ুদূষণ এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় সংকট। এ সংকট মোকাবিলায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সাভার উপজেলা পরিষদের বিজয়-৭১ সভাকক্ষে ক্যাবের উদ্যোগে ‘বায়ুদূষণ হ্রাসে ইটভাটা ও পরিবহন খাতের অংশীজনদের করণীয় ও ভোক্তা সম্পৃক্ততা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন ক্যাব সাভার উপজেলা কমিটির সভাপতি ড. মো. কামরুজ্জামান। প্রধান অতিথি ছিলেন সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন ক্যাবের উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার। সভা সঞ্চালনা করেন ক্যাব সাভার উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সীমান্ত সিরাজ।
সভায় উপস্থিত ছিলেন ক্যাবের নির্বাহী পরিচালক আহম্মদ একরামুল্লাহ, সাভার সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক দীপক কুমার রায়, সাভার নাগরিক কমিটির সভাপতি আবদুর রহিম, ফোয়াসের সভাপতি রোটারিয়ান ওয়াকিলুর রহমান, সাভার প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি সাংবাদিক জাভেদ মোস্তফা, সনাক-টিআইবি সাভারের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল কাদের শাহীন, জনপ্রতিনিধি ডারফিন আক্তার, কলকাকলী স্কুলের অধ্যক্ষ ও শিক্ষক নেতা শফিকুল ইসলাম পাটোয়ারী, দুপ্রকের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট শাহীন আলম, সাভার কার মালিক সমিতির সভাপতি মো. মোসলেম উদ্দিন, ইটভাটা মালিক সমিতির প্রতিনিধি আহম্মদ হোসেন, গ্রামীণ শিক্ষার ডিজিএম আবদুর রহমান চৌধুরী এবং জাগ্রত বিবেক ফাউন্ডেশনের সভাপতি মনিমুক্তা ইসলামসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।
মূল নিবন্ধে অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বায়ুদূষণের উৎস, ক্ষতিকর প্রভাব ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের উপায় তুলে ধরেন। তিনি ইটভাটা, যানবাহন ও শিল্পকারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, বায়ুমান পর্যবেক্ষণ, বৈজ্ঞানিক তথ্যের ব্যবহার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মুক্ত আলোচনায় বক্তারা বলেন, সাভারের শিল্পাঞ্চল, বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও জনবহুল এলাকায় ধুলাবালি, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, ইটভাটা ও কলকারখানার নির্গমন বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস। এতে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। দূষণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, যানবাহনের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশদূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তাঁরা।
প্রধান অতিথি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, বায়ুদূষণ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বাস-ট্রাক মালিক সমিতি ও ইটভাটা মালিক সমিতির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের সচেতনতা ও দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ক্যাবের উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষায় জনগণকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহি, আইনগত সচেতনতা এবং সামাজিক আন্দোলন জোরদার করতে হবে।
ক্যাবের নির্বাহী পরিচালক আহম্মদ একরামুল্লাহ বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে ভোক্তা অধিকার আন্দোলন আরও শক্তিশালী করতে হবে। নিরাপদ পণ্য, ন্যায্য মূল্য ও সঠিক পরিমাপ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দূষণমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব সমাজ গঠনে সবাইকে কাজ করতে হবে। বায়ুদূষণ মানুষের স্বাস্থ্য, জীবনযাত্রা ও নিরাপদ পরিবেশে বসবাসের অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সাভার সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক দীপক কুমার রায় বলেন, ভোক্তা অধিকার ও পরিবেশ সংরক্ষণে স্থায়ী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে।
সাভার নাগরিক কমিটির সভাপতি আবদুর রহিম বাজারে পণ্যের গুণগত মান, মূল্য ও সঠিক পরিমাপ নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকির ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও শিল্পাঞ্চলে ধুলাবালি ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনার আহ্বান জানান।
সাভার প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি সাংবাদিক জাভেদ মোস্তফা বলেন, বায়ুদূষণ ও ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা জনসমক্ষে তুলে ধরতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, তথ্য যাচাই এবং পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
কবি ও লেখক মুহাম্মদ শামসুল হক বাবু ভোক্তা অধিকার আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা এবং অধিকার লঙ্ঘিত হলে আইনি প্রতিকার নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি ভেজাল পণ্য, ভুল ওজন, নিম্নমানের পণ্য ও পরিবেশদূষণ রোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং ইটভাটা ও কলকারখানার কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।
সাভার পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ডারফিন আক্তার পরিবেশ সুরক্ষা, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করতে নাগরিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানান।
দুপ্রকের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট শাহীন আলম ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরে অধিকার লঙ্ঘিত হলে আইনি প্রতিকার গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন প্রচারমূলক কর্মসূচি গ্রহণের প্রস্তাব দেন। নিরাপদ খাদ্য, ন্যায্য মূল্য, সঠিক ওজন ও মানসম্মত পণ্য নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ী, আড়তদার, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সাভার কার মালিক সমিতির সভাপতি মো. মোসলেম উদ্দিন বলেন, বায়ুদূষণ প্রতিরোধে পরিবহন মালিকদের পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও প্রশাসনের দায়িত্ব রয়েছে। যানবাহনের কালো ধোঁয়া, প্লাস্টিক পোড়ানো এবং গণপরিবহন খাতে দূষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বাস-ট্রাক মালিক সমিতির মাধ্যমে চালকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব আচরণ, আইনের প্রয়োগ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে পরিবহন খাতে বায়ুদূষণ কমাতে সম্মিলিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে।
ইটভাটা মালিক সমিতির প্রতিনিধি আহম্মদ হোসেন বলেন, ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার, জ্বালানির সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রচলিত পরিবেশগত বিধিবিধান মেনে চলা জরুরি। ইটভাটা মালিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষা ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। ইটভাটা মালিকদেরও এ দায়িত্ব পালনে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। এ ক্ষেত্রে মালিক সমিতি, প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বায়ুদূষণ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
সভাপতির বক্তব্যে ড. মো. কামরুজ্জামান বলেন, বায়ুদূষণ এখন আর শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের সংকটে পরিণত হয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় ভোক্তাদের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। তরুণদের প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ, নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। তিনি সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা, ভেজালবিরোধী কার্যক্রম জোরদার এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। সেইসাথে ব্যবসায়ীদের সৎ ও নীতিনিষ্ঠভাবে ব্যবসা পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানান।