জাতিসংঘ কতটা কার্যকর, প্রশ্ন খলিলুর রহমানের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩:৪৭, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘ কতটা কার্যকর, প্রশ্ন খলিলুর রহমানের

জাতিসংঘ ৮০ বছর ধরে টিকে আছে। তবে শুধু এটিকে সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বৈশ্বিক জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে সংস্থাটিকে নিজেদের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতার ‘কঠিন সত্য’ স্বীকার করে গভীর সংস্কারের পথে যেতে হবে।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এ কথা বলেন পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান।

তিনি বলেন, ১৯৪৫ সালে ৫০টি সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে যাত্রা শুরু করা জাতিসংঘের সদস্য এখন ১৯৩টি। তবে দীর্ঘদিন টিকে থাকা মানেই সফলতা নয়। বরং এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—জাতিসংঘ বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে।

এই দেয়ালের বাইরে মানুষ প্রশ্ন করছে না যে জাতিসংঘ এখনো টিকে আছে কি না। তারা জানতে চাইছে, এটি কাজ করছে কি না, বলেন খলিলুর রহমান।

বৈশ্বিক অর্থায়নে বৈষম্যের বিষয়টিও তুলে ধরেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি। তিনি বলেন, এক বছরে উন্নয়ন সহায়তা ২৩ শতাংশ কমে প্রায় ১৭৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। সামরিক ব্যয় টানা ১১ বছর ধরে বাড়ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে এর মধ্যেও কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি। তিনি জানান, গত এক দশকে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ নিরাপদ সুপেয় পানির সুবিধা পেয়েছেন। বিশ্বের ৯২ শতাংশ মানুষ এখন বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। একই সময়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৪০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

জাতিসংঘের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনে তিনটি পথের কথা বলেন খলিলুর রহমান। এগুলো হলো—প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা সৎভাবে স্বীকার করা, সামান্য বাজেট পরিবর্তনের বাইরে গিয়ে গভীর কাঠামোগত সংস্কার করা এবং ব্যবসায়ী, বিজ্ঞানী ও নাগরিক সমাজকে বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা।

তিনি বলেন, ‘আস্থা কেউ দিয়ে যায় না, এটি অর্জন করতে হয়। নিষ্ক্রিয় মালিকানা যথেষ্ট নয়। আমরা যদি এই প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় দায়িত্ব না নিই, তাহলে এটি সুস্থ হয়ে উঠবে—এমন আশা করতে পারি না।’

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। আট দশক ধরে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও মহাদেশটির এখনো কোনো স্থায়ী আসন নেই।

খলিলুর রহমান বলেন, ন্যায়বিচার, ন্যায্যতা ও জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতার স্বার্থে এর পরিবর্তন প্রয়োজন। ‘আফ্রিকার টেবিলে একটি আসন প্রয়োজন, মেনুতে থাকার জন্য নয়,’ বলেন তিনি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার নিয়েও সতর্ক করেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি। তিনি বলেন, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ব্যবস্থায় এরই মধ্যে এআই যুক্ত হয়েছে। তাই সরকারের বাইরে থাকা বিজ্ঞানীদের মতামত নিয়ে এআই ব্যবহারের জন্য ‘সতর্ক ও নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা কাঠামো’ তৈরি করতে হবে।

তিনি মত দেন, এআই নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা যেন বিশ্বকে বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে না দেয়।

সীমান্ত পেরিয়ে ঘৃণামূলক বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার বিষয়েও উদ্বেগ জানান তিনি। নারী ও কিশোরী, সংখ্যালঘু, অভিবাসী, শরণার্থী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এসব বয়ানের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

খলিলুর রহমান বলেন, ইসলামোফোবিয়া, ইহুদিবিদ্বেষ, সমকামীবিদ্বেষ কিংবা নারীবিদ্বেষ—সবই ঘৃণার ভিন্ন রূপ।

তিনি উল্লেখ করেন, প্রযুক্তিকে ভয় ও বিভাজন বাড়ানোর পরিবর্তে মানুষের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ানো এবং সবার মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করতে হবে।

জাতিসংঘের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলো সাময়িক পদক্ষেপে সমাধান করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী রোগের জন্য যখন প্রয়োজন গভীর রোগনির্ণয় ও সুদূরপ্রসারী চিকিৎসা পরিকল্পনা, তখন সাময়িক ব্যথানাশক দিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া যায় না।’

জাতিসংঘের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্গঠনে এখনই কাজ শুরু করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই কাজ সহজ নয়, রাতারাতিও সম্ভব নয়। তবে আগামী বহু দশক সংস্থাটিকে কার্যকর রাখতে হলে পরিবর্তনের কাজ এখনই শুরু করতে হবে।

আরও পড়ুন

শীর্ষ সংবাদ: