নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
প্রকাশ: ১৬:৩৬, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮’র বিচারক মো. আব্দুল মোক্তাদিরের আদালতে আসামিদের হাজির করা হয়। এ সময় আসামি পক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসেন আপসের বিষয়টি আদালতকে জানান।
আইনজীবী আলমগীর হোসেন বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে ৯ লাখ টাকায় আপস হয়েছে। ইতোমধ্যে ওই টাকা নিহতের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া হয়েছে। আপসনামায় সই করে তারা আসামির জামিন বা খালাসের বিষয়ে কোনো আপত্তি না থাকার কথা জানিয়েছেন।
আইনজীবী আলমগীর হোসেন আরও বলেন, যে ছেলেটা, উনি ছিলেন বাক্প্রতিবন্ধী। উনি কানেও শুনতেন না এবং কথাও বলতে পারতেন না। আর যে অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছে, অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার পরে ওরাও কোনো আপত্তি করেনি, তাদের কোনো অভিযোগ নেই। আমাদেরও কোনো অভিযোগ নেই। আমরা উভয়ে মিলেমিশে, ওদের মা-বাবা বুড়ো, তাদের দেখাশোনার ভারের জন্য মধ্যস্থতার মাধ্যমে ৯ লাখ টাকা ওদের হিসাব করে দিয়ে দিয়েছি।আপসনামায় সই করে দিয়ে গেছে। এই মামলায় আসামি যদি জামিন পায়, খালাস পায়, তাহলে কোনো আপত্তি নেই।
এই আপসনামাটা কে করেছে? এই অ্যাক্সিডেন্টটা তো ড্রাইভারের, উনি তো আন্ডারএজ, প্রশ্ন করা হলে আইনজীবী বলেন, আন্ডারএজ গাড়ি চালিয়েছে? না, না, সে গাড়ি চালায়নি। গাড়ি যখন উল্টে গেছে, তখন সে ওইদিক দিয়ে বের হয়েছে।
আপসটা হয়েছে কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, শান্তা মরিয়মের (ডেভেলপার কোম্পানির নাম) অফিসে। উনাদের কর্মকর্তারা ছিলেন, উনাদের প্রতিনিধিরা ছিলেন, আমরা ছিলাম, ওর মামা-ভাই সবাই ছিল। ওদের ইচ্ছেতেই এটা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর পরিবারকে কোনো ভয় দেখানো হয়েছে কিনা, তাদের কত টাকা দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে আলমগীর হোসেন বলেন, কোনো ভয়ভীতি, চাপ, কিছুই তাদের দেখানো হয়নি। এ নিয়ে তাদের কোনো অভিযোগ নেই। ৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
টাকা দিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছে? উত্তরে তিনি বলেন, হ্যাঁ, দেওয়া হয়েছে। তারা নিয়ে গেছে। এবং তারা পোস্টমর্টেমও করাতে রাজি হয়নি। তারা মামলাও করতে চায়নি।
মামলা কীভাবে হলো, প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, যেহেতু অ্যাক্সিডেন্ট ওই দিনের, পুলিশ মামলাটা করেছে।
একটি জীবনের মূল্য ৯ লাখ টাকা হতে পারে? এমন প্রশ্নের উত্তরে আইনজীবী বলেন, ‘নিহত পথচারী প্রতিবন্ধী ছিলেন। বাদীরা মনে করেছেন আপস করবেন। তারা এ আপসে খুশি। উনারা ১০ লাখ টাকা দাবি করছিলেন। আমরা বলে ৯ লাখ টাকা ঠিক করেছি। আমাদের যেহেতু এজাহারে নাম নেই, আন্ডারএজ, আমরা জামিন চাই।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে বারিধারা ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে বসে থাকা নির্মাণ শ্রমিক মেহেদী হাসান মীমকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনাটি ঘটে। হত্যার ঘটনায় চালকের আসনে থাকা কিশোর আজান আলী শরীফকে নিয়ে তৈরি হয় নানা প্রশ্ন। দুর্ঘটনার পর উপস্থিত লোকজন তাকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করলেও প্রথমে তাকে মামলায় আসামি করা হয়নি। পরে সিসিটিভি ফুটেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে গাড়ি চালানোর বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর তাকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফুটপাতে বসে বিশ্রাম করছিলেন মেহেদী। এ সময় একটি নীল রঙের প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে তাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। গাড়ির নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। দুর্ঘটনার পর গাড়ির ডান পাশের চালকের আসন থেকে কালো টিশার্ট ও হালকা ধূসর ট্রাউজার পরা আজান আলী শরীফ বেরিয়ে আসেন। গাড়ির বাম পাশ থেকে বেরিয়ে আসেন আকাশ মারক, যিনি আজানের বাবা আব্বাস আলী শরীফের গাড়িচালক হিসেবে কর্মরত।
ঘটনাস্থল থেকে পালানোর চেষ্টার সময় স্থানীয়রা আজানকে আটক করে পুলিশে দেন। তবে পরে তাকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। নিহতের ভাই মোক্তাদীর ইসলাম বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা করেন। মামলায় গাড়িচালক আকাশ মারককে আসামি করা হলেও প্রথমে আজানের নাম রাখা হয়নি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এর মধ্যেই প্রকাশ্যে আসে দুর্ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ। ফুটেজে দেখা যায়, মেহেদীকে ধাক্কা দেওয়া গাড়ির ডান পাশের চালকের দরজা দিয়ে আজানই বেরিয়ে আসছেন। পরে বিষয়টি নিয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আজান আলী শরীফ গুলশানের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী। তার বাবা বাংলাদেশ বিমানের পাইলট আব্বাস আলী শরীফ। দুর্ঘটনায় ব্যবহৃত প্রোটন এস৭০ গাড়িটি আব্বাস আলী শরীফের স্ত্রী সিগমা আব্বাসের নামে নিবন্ধিত।
থানা পুলিশের একটি সূত্রে জানায়, এদিকে নিহত মেহেদীর ভাই মোক্তাদীর খবর শুনে আসার পর তাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন আজানের পরিবারের সদস্যরা। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে আজানকে আসামি না করে চালককে আসামি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে নানামুখী চাপের মুখে চালক আকাশ মারককে একমাত্র আসামি করে মামলা করেন মোক্তাদীর।
তবে কেন আজানকে আসামি করা হয়নি, তা জানতে একাধিকবার মোক্তাদীরের নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। অন্য একটি সূত্র জানায়, আজানের পরিবারের চাপেই নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ রাখেন মোক্তাদীর।
এদিকে আজানের বাবা আব্বাস আলী শরীফ ও মা সিগমা আব্বাসের ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে জানা যায়, আব্বাস আলী শরীফ তার এক ভাইকে থানায় পাঠিয়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। দিনভর সমালোচনা ও নাটকীয়তার পর বুধবার সন্ধ্যায় আজানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এদিকে মামলায় নাম থাকা চালক আকাশ মারক পলাতক রয়েছে।
শীর্ষ সংবাদ: