নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১:৩৫, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করে সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ ঘটাতে চায় সরকার। এ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিচিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, দেশের শিল্পী, সংগীতশিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, নাট্যকর্মী ও কারুশিল্পীদের সৃষ্টিশীল কাজের যথাযথ মূল্যায়ন এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে অর্থনীতিতে নতুন একটি শক্তিশালী খাত গড়ে তোলা সম্ভব। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার বেসরকারি খাত ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ক্রিয়েটিভ ফুটপ্রিন্টস: মডার্ন অ্যান্ড কনটেম্পোরারি আর্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আমির খসরু বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনায় শিল্প ও সংস্কৃতি দীর্ঘদিন যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। অথচ এসব বিষয় বাঙালির মনন, প্রাণ ও আত্মার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। মানুষ শিল্প, সংগীত ও থিয়েটার ভালোবাসলেও এসব সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ যথেষ্ট ছিল না।
সৃজনশীল শিল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে এ খাতের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। সেখানে থিয়েটার, শিল্পকলা প্রদর্শনী, নকশাপণ্যের দোকান ও সাংস্কৃতিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশেও এমন পরিবেশ গড়ে তোলা গেলে শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হবে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশি অতিথিদের নিয়ে যাওয়ার মতো সাংস্কৃতিক ও বিনোদনকেন্দ্রিক স্থানের অভাব রয়েছে দেশে। এ ধরনের স্থান গড়ে তোলা গেলে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পাবে এবং দর্শনার্থীদের ব্যয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিও উপকৃত হবে।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ জরুরি উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, শুধু সরকারি উদ্যোগে সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। নীতি ও অর্থায়নের পাশাপাশি কার্যকর অংশীদারত্ব প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে থিয়েটারকেন্দ্রিক এলাকা গড়ে তোলা, চলচ্চিত্র ও সংগীতের প্রচার এবং শিল্পকর্মের বাজারমূল্য বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শিল্পীদের সৃষ্টিকর্মের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি পাহাড়ি এক শিল্পীর কাছ থেকে কয়েকটি চিত্রকর্ম কিনেছিলেন তিনি। প্রতিটি ছবির জন্য পাঁচ হাজার টাকার পরিবর্তে ১০ হাজার টাকা করে দেন। পরে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ওই শিল্পীর চিত্রকর্মের প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সেখানে ছবিগুলোর প্রতিটির মূল্য ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ওঠে।
তিনি বলেন, শিল্পীদের কাজের যথাযথ পরিচিতি, প্রদর্শনীর সুযোগ ও বাজার তৈরি করা গেলে সৃষ্টিকর্মের মূল্য অনেক বাড়ানো সম্ভব। একইভাবে সংগীত, চলচ্চিত্র, থিয়েটার ও কারুশিল্পের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে।
কারুশিল্পীদের সহায়তার পরিকল্পনা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, তাঁদের আর্থিক সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, নকশা প্রণয়ন, ব্র্যান্ডিং ও অনলাইন বিপণনে সহযোগিতা দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে অ্যামাজন, ইবে ও আলিবাবার মতো আন্তর্জাতিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তাঁদের পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে।
আমির খসরু বলেন, সৃজনশীল শিল্প শুধু ব্যবসা কিংবা ঐতিহ্যের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রভাব বা ‘সফট পাওয়ার’ বাড়ানোরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। দেশের সংগীত, চলচ্চিত্র, থিয়েটার ও কারুশিল্প বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে বাংলাদেশের নিজস্ব পরিচিতি আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি জানান, সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে বাজেটে অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে এ খাতে আরও অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে। এ উদ্যোগে বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলোকেও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রীর আশা, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশে সাংস্কৃতিক অগ্রগতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক বলেন, বাংলাদেশের সমৃদ্ধ শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দেশের ইতিহাস, মানুষের জীবন এবং পরিবর্তনের গল্প তুলে ধরে। ‘ক্রিয়েটিভ ফুটপ্রিন্টস’ বইটিতে বাংলাদেশের আধুনিক ও সমসাময়িক শিল্পকলার বৈচিত্র্য, শিল্পীদের সৃজনশীলতা এবং তাঁদের কাজের পেছনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, শিল্প মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে এবং ভাষা ও ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে একত্রিত করে। সংস্কৃতি ও পরিচয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি সৃজনশীলতা কর্মসংস্থান, ব্যবসার প্রসার, উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও অবদান রাখতে পারে।
বাংলাদেশে সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সারাহ কুক বলেন, সৃজনশীলতার মাধ্যমে নতুন মূল্য সৃষ্টি, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশের শিল্প, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।