আলমডাঙ্গা পৌরসভার উন্নয়নকাজ অনিশ্চিত, পুনঃদরপত্রের উদ্যোগ

এম সনজু আহমেদ, চুয়াডাঙ্গা:

প্রকাশ: ২২:২৫, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আলমডাঙ্গা পৌরসভার উন্নয়নকাজ অনিশ্চিত, পুনঃদরপত্রের উদ্যোগ

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা পৌরসভার সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ১৭ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও এখনো শুরু হয়নি উন্নয়নকাজ। নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরুর কথা থাকলেও প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেছে। সর্বনিম্ন দরদাতা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চুক্তি স্বাক্ষর না করায় আটকে যায় প্রকল্পের কার্যক্রম। পরে দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বাবানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আইনগত জটিলতায় দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে পুরো প্রক্রিয়া। এতে সড়ক, ড্রেন ও সড়কবাতি স্থাপনের অপেক্ষায় থাকা পৌরবাসীর দুর্ভোগও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

তবে বর্তমানে আগের দরপত্র বাতিল করে দ্রুত পুনঃদরপত্র আহ্বাবানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর নগর সমন্বয় কমিটির সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (আইইউজিআইপি) তৃতীয় ধাপের আওতায় এ উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত মূল্য ১৬ কোটি ৫৯ লাখ ৯১ হাজার ১৬৫ টাকা। প্যাকেজ নম্বর ওটএওচ/অখঅগ/টঞ+উজ/০৩/২০২৩ এবং টেন্ডার আইডি ১১৪৫৭২৬।

পৌরসভা কার্যালয়ের টেন্ডার রিপোর্ট অনুযায়ী, দরপত্রে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে ইউসিএল ও জেটি (জেভি) সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি ১৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩৮ হাজার ৬০০ টাকা দর প্রস্তাব করে। পরে ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ) দেওয়া হয়।

নথি অনুযায়ী, চুক্তি সম্পাদনের আগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির ৬৮ লাখ ৯৬ হাজার ৯৩০ টাকা পারফরম্যান্স সিকিউরিটি জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওই অর্থ জমা না দেওয়ায় চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। পরে ঠিকাদার সময় বাড়ানোর আবেদন করেন।

এ অবস্থায় ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে আইনগত প্রতিকার চেয়ে ‘নোটিশ ফর ডিমান্ডিং জাস্টিস’ দেওয়া হয়। এরপর থেকে দরপত্রের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে টেন্ডার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় আলমডাঙ্গা পৌরসভার ১৪টি স্থানে ডিবিসি ও আরসিসির মাধ্যমে মোট ৮ হাজার ৯৫৯ মিটার সড়ক নির্মাণ ও উন্নয়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দুটি ক্রস-ড্রেন, ৪৯৪ মিটার পালসাডিং, ২৭৮টি স্ট্রিটলাইট এবং পাঁচটি স্থানে আরসিসির মাধ্যমে ১ হাজার ১৯৭ মিটার ড্রেন নির্মাণের কথা রয়েছে।

পৌরসভার প্রকল্প প্রাক্কলন নথিতে থাকা ১০টি কাজের মোট নেট প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৯ কোটি ৯০ লাখ ২৬ হাজার টাকা। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে—

এরশাদপুর নতুন বাজার থেকে এরশাদপুর একাডেমি স্কুল পর্যন্ত ৬৫২ মিটার ডিবিসি সড়ক ও ২৩টি স্ট্রিটলাইট স্থাপনে ৯০ লাখ ১১ হাজার ৮২০ টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে।

এরশাদপুর চাতাল মোড় থেকে সবেদ আলী চেয়ারম্যানের বাড়ি পর্যন্ত ৮৭২ মিটার সড়ক, একটি ক্রস-ড্রেন ও ৩১টি স্ট্রিটলাইট নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ২৬ হাজার ৪৪৪ টাকা।

এরশাদপুর ঈদগাহ থেকে আলমের বাগান পর্যন্ত ৪২৮ মিটার সড়ক ও ছয়টি স্ট্রিটলাইট স্থাপনে প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪২ লাখ ৪২ হাজার ৩০৮ টাকা।

আনন্দধাম ব্রিজ থেকে এরশাদপুর নতুন বাজার ও সংযোগ সড়কের মোট ১ হাজার ৩৬৪ মিটার উন্নয়ন, একটি ক্রস-ড্রেন ও ৪৬টি স্ট্রিটলাইট নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৪ হাজার ৮৫২ টাকা।

গোবিন্দপুর মাঠপাড়া থেকে নাজিম ইসলামের দোকান পর্যন্ত ১৬৬ মিটার সড়ক ও ছয়টি স্ট্রিটলাইট স্থাপনে ৫০ লাখ ২১ হাজার ৬৬৮ টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে।

চারতলা সত্যনারায়ণ মন্দির থেকে একাত্তর চত্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৪১১ মিটার সড়ক ও ৫০টি স্ট্রিটলাইট নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৬৯ লাখ ৯ হাজার ৮৫৯ টাকা।

কাচারি বাজার থেকে শুরু হওয়া ৩৭০ মিটার আরসিসি সড়ক ও ১৩টি স্ট্রিটলাইট স্থাপনে প্রাক্কলন করা হয়েছে ২৬ লাখ ১১ হাজার ৩১৪ টাকা।

চাতাল মোড় থেকে হাইরোড এবং লোকমান ক্লিনিকের সামনে থেকে রাজ্জাকের দোকান পর্যন্ত ১ হাজার ১৩৮ মিটার আরসিসি সড়ক ও ৩০টি স্ট্রিটলাইট নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৬৫ লাখ ৮৮ হাজার ৩৩১ টাকা।

বন্ডবিল ঈদগাহপাড়া থেকে জিকে খাল পর্যন্ত ৩১৬ মিটার সড়ক ও ১১টি স্ট্রিটলাইট স্থাপনে ৩৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫৩৮ টাকা এবং গোবিন্দপুর হরিতলা থেকে গোবিন্দপুর হরি বাড়ি পর্যন্ত ১২৬ মিটার সড়ক ও পাঁচটি স্ট্রিটলাইট নির্মাণে ১৫ লাখ ১২ হাজার ২৮০ টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে।

আলমডাঙ্গা পৌরসভার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখের ই-টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল ওই বছরের ২১ অক্টোবর বিকেল ৪টা। দরপত্র খোলার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ২২ অক্টোবর দুপুর ১টা।

দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, কাজ শুরুর সম্ভাব্য তারিখ ছিল ১ ডিসেম্বর ২০২৫। আর কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৭। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চুক্তি স্বাক্ষর না করায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করা যায়নি। ফলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ঠিকাদার চুক্তি না করায় নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র বাতিলের উদ্যোগ নেয় পৌরসভা। তবে ঠিকাদারের দেওয়া আইনগত নোটিশের কারণে পরবর্তী কার্যক্রম আটকে যায়। তাদের দাবি, ওই নোটিশের ভিত্তিতে উচ্চ আদালতে কোনো রিট করা হয়নি। ফলে আগের দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বানে বর্তমানে আইনগত বাধা নেই।

পৌরসভার মামলার পরামর্শক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাজেদুর রহমান প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যালোচনা করেছেন। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী, আগের দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বানে আইনগত বাধা নেই বলে মত দেওয়া হয়েছে। আইইউজিআইপি প্রকল্পের পরিচালকও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আলমডাঙ্গা পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) আসাদুজ্জামান বলেন, “প্রকল্পটির বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলছে।”

পৌরসভার সচিব রাকিবুল ইসলাম বলেন, “পুনঃদরপত্র আহ্বাবানের কাজ গোপনীয়ভাবে চলছে। আগামী ২৮ তারিখে নগর সমন্বয় কমিটির সভা করে সেই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খুব দ্রুতই বিষয়টির সমাধানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।”

পৌরসভার এ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিভিন্ন এলাকার সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং রাতে চলাচলে সড়কবাতির সুবিধা বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে প্রকল্পের কাজ কবে নাগাদ শুরু হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

প্রায় ১৭ কোটি টাকার এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পৌরবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে উন্নয়নকাজ শুরু করা হবে। দীর্ঘদিনের সড়ক ও অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধানে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ চান তাঁরা।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন

শীর্ষ সংবাদ: