মণিরামপুর আনসার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

নয়ন রায়, মণিরামপুর

প্রকাশ: ১০:৩৫, ৪ অক্টোবর ২০২৬

মণিরামপুর আনসার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

রক্ষকের দায়িত্ব যার, তার বিরুদ্ধেই উঠছে ভক্ষকের অভিযোগ। একের পর এক অনিয়ম, অর্থ লেনদেন, স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে আলোচনায় যশোরের মণিরামপুর উপজেলা আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তা আব্দুর রউফ (পিভিএম)। তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ গেছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালকের দপ্তরে। অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন নথিপত্রের কপিও।

অভিযোগকারী মণিরামপুর পৌরসভার ৫ নম্বর তাহেরপুর ওয়ার্ডের দলনেতা মো. রবিউল ইসলাম-১। তার অভিযোগ, জাতীয় পুরস্কার পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ১৫ নম্বর কুলটিয়া ইউনিয়নের আনসার প্লাটুন কমান্ডার মো. রবিউল ইসলাম-২-এর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়েছে। পরে সেই পুরস্কারের জন্য অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে একটি ফাইল প্রস্তুত করে জেলা কার্যালয়ে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

রবিউল ইসলামের ভাষ্য, বিষয়টি শুধু একজন সদস্যকে পুরস্কার পাইয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মাধ্যমে বাহিনীর নিয়ম-কানুন ও শৃঙ্খলাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলা হয়েছে। তার দাবি, প্রকৃত যোগ্যদের পাশ কাটিয়ে অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে কাউকে এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে মাঠপর্যায়ের সৎ ও পরিশ্রমী সদস্যদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। এরই মধ্যে সামনে এসেছে খেদাপাড়া ইউনিয়নের গ্রাম ভিডিপি প্রশিক্ষণের আরেক চিত্র। হেলাঞ্চী-কৃষ্ণবাটী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ১০ দিনের ওই প্রশিক্ষণে ৬৪ জন প্রশিক্ষণার্থীর কাছ থেকে মাথাপিছু এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

প্রশিক্ষণার্থীদের নাস্তার জন্য প্রতিদিন মাথাপিছু ৬৫ টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে দেওয়া হয়েছে প্রায় ১৫ টাকার নাস্তা—একটি কলা, একটি কেক ও একটি সিঙ্গারা। বরাদ্দের বাকি অর্থ কোথায় গেল, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরছে প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে।

শুধু তাই নয়, আসন্ন দুর্গাপূজায় আনসার সদস্যদের ডিউটি দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রত্যেকের কাছে এক হাজার টাকা করে দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মাঠপর্যায়ের সদস্যদের প্রশ্ন—সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য যদি সদস্যদের কাছ থেকেই টাকা দিতে হয়, তাহলে বরাদ্দ ও ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা কোথায়?

প্রশিক্ষণার্থী তালিকা নিয়েও রয়েছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মণিরামপুর উপজেলার নাগরিকদের নিয়ে প্রশিক্ষণ হওয়ার কথা থাকলেও নড়াইলের কালিয়া উপজেলার ইমা খানম নামে এক নারীর নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজের পরিচয় নিশ্চিত করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, উপজেলা কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রেই তার নাম তালিকায় এসেছে।১০ দিনের ওই প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে সম্মানীর অর্থ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের জন্য দুই হাজার টাকা সম্মানী নির্ধারিত থাকলেও সেখানে চার হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে মাঠপর্যায়ে ক্ষোভ আরও বেড়েছে।

এদিকে মণিরামপুর বাজারে যশোর-সাতক্ষীরা মহাসড়কের যানজট নিরসনে দায়িত্ব পালনকারী ১৬ জন আনসার সদস্যের দৈনিক হাজিরা বাবদ ৬৫০ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়ার কথা থাকলেও প্রত্যেককে ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক সদস্য। তাদের দাবি, বাকি ১৫০ টাকা করে রাখা হয়েছে।

অভিযোগের এখানেই শেষ নয়। দলনেতা মো. রবিউল ইসলাম-১ এক মাদক কারবারিকে আটক করতে গিয়ে আহত হয়েছেন—এমন তথ্য উল্লেখ করে যশোর অফিসে আবেদন করানোর জন্য উপজেলা কর্মকর্তা আব্দুর রউফ তার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে রবিউল ইসলামের দাবি, মাদক কারবারিকে আটক করার সময় তিনি গুরুতর আহত হননি। আর্থিক সহায়তা পাওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে দিয়ে ওই আবেদন করানো হয়েছিল।

সব মিলিয়ে উপজেলা আনসার-ভিডিপির মাঠপর্যায়ে এখন একের পর এক প্রশ্ন। সরকারি দায়িত্ব পালন, প্রশিক্ষণ, সদস্য নির্বাচন, পুরস্কারের সুপারিশ কিংবা ডিউটি—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই উঠছে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।জানা গেছে, আব্দুর রউফ প্রায় চার মাস আগে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে সুনামগঞ্জ থেকে মণিরামপুর উপজেলা আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। এর আগে নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে নারীঘটিত একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তাকে বদলি করা হয়েছিল বলে অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে এ তথ্যের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তা আব্দুর রউফের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

যশোর জেলা আনসার কর্মকর্তার কার্যালয়েও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পরে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর খুলনা বিভাগীয় উপমহাপরিচালক মো. আশরাফুল আলমের (বিএএমএস, বিভিএমএস) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এসব অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তবে অভিযোগের কপি পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন