তানভীর সৌরভ,খুলনা
প্রকাশ: ১৭:১৪, ১২ অক্টোবর ২০২৬
দক্ষিণবঙ্গের চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসাস্থল খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় চার গুণ রোগীর এই অস্বাভাবিক চাপ সামলাতে গিয়ে হাসপাতালের সাধারণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। শয্যা না পেয়ে রোগীদের ঠাঁই হয়েছে মেঝে, করিডোর, বারান্দা, এমনকি ভবনের সিঁড়ির পাশে। অন্যদিকে, চিকিৎসকের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও ১৯৯২ সালের পর দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে প্রশাসনিক ও চতুর্থ শ্রেণীর কোনো স্থায়ী জনবল নিয়োগ না হওয়ায় হাসপাতালটি এখন অচল হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সন্তান কোলে মা-বাবার চোখের পানি।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে মানবিক বিপর্যয় ও ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু ওয়ার্ডের রোগীরা। সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গু ও হামের প্রকোপ বাড়ায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশু রোগী। জ্বরে কাতর সন্তানকে কোলে নিয়ে শয্যার আশায় এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে হন্যে হয়ে ছুটছেন অসহায় অভিভাবকরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না কোনো খালি শয্যা। এক ভুক্তভোগী মা কান্নাভেজা চোখে বলেন, "বাচ্চার প্রচণ্ড জ্বর। একটা বেডও খালি নেই। রাতের বেলা এই অসুস্থ শিশুকে মেঝেতে কীভাবে রাখব, কীভাবে দেখাশোনা করব, ভেবে বুক ফেটে যাচ্ছে।" চিকিৎসা শেষে সুস্থ আপনজনকে নিয়ে বাড়ি ফেরার যে আশা নিয়ে মানুষ এখানে আসেন, হাসপাতালের দরজায় পা রেখেই তা রূপ নিচ্ছে চরম ভোগান্তিতে।
আউটসোর্সিংয়ে জোড়াতালির সেবা, ডিসেম্বরেই শূন্য হবে জনবল
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, খুমেক হাসপাতালে ২৭৮টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের মধ্যে ১৮টি এবং ৫১০টি নার্স পদের মধ্যে ১৮টি পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় চলছে প্রশাসনিক ও সহকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী স্তরে।
এ বিষয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোঃ আলিমুজ্জামান উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, "হাসপাতালটি ৫০০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পর ডাক্তার নিয়োগ হলেও ১৯৯২ সালের পর থেকে কোনো প্রশাসনিক বা তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর স্থায়ী জনবল নিয়োগ হয়নি। বর্তমানে সরকারি লোক নেই বললেই চলে। যা-ও আছেন, ২০২৬ সালের আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে অবসরে যাওয়ার কারণে তা প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছাবে।"
তিনি আরও জানান, বর্তমানে হাসপাতালের বেশিরভাগ কাজই আউটসোর্সিংয়ের অস্থায়ী কর্মীদের দিয়ে করানো হচ্ছে। কর্মরতদের ওপর বাড়তি কাজের চাপ থাকায় প্রত্যেকে একাধিক দায়িত্ব পালন করছেন, যা সেবার মানকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এই সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বারবার চিঠি পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সদুত্তর বা কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
চলাচলের রাস্তাও রোগীতে ঠাসা।
রোগীর এই উপচে পড়া চাপ আর সীমিত জনবল নিয়ে কতদিন এই হাসপাতাল চালানো সম্ভব—তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো: আখতারুজ্জামান বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করে বলেন, "হাসপাতালে যে হারে ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপ বাড়ছে, তা সামলানো আমাদের জন্য আসলেই অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে যে, হাসপাতালের ভেতরের সাধারণ চলাচলের রাস্তাগুলোও এখন রোগীতে ঠাসা। দক্ষিণবঙ্গের এই স্বনামধন্য হাসপাতালে সর্বদাই ২ হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসাধীন থাকেন। আমরা আমাদের এই অত্যন্ত স্বল্প জনবল ও সীমাবদ্ধতা দিয়েই রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি।"
ভুক্তভোগী জনসাধারণ ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বিভাগীয় পর্যায়ের এই গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালে অতি দ্রুত জরুরি ভিত্তিতে প্রশাসনিক জনবল নিয়োগ করা হোক। একই সাথে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি, আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও পর্যাপ্ত বাজেটের ব্যবস্থা করে সাধারণ মানুষের ন্যূনতম স্বস্তির চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।