আগাম শীতের সবজিতে স্বপ্ন বুনছেন ধুনটের কৃষকেরা

আশেকে এলাহী শিবলী, ধুনট (বগুড়া)

প্রকাশ: ১৮:৪৬, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

আগাম শীতের সবজিতে স্বপ্ন বুনছেন ধুনটের কৃষকেরা

শীত এখনো পুরোপুরি জেঁকে বসেনি, তবে ধুনটের মাঠে মাঠে এরই মধ্যে লেগেছে শীতকালীন সবজি চাষের ব্যস্ততার ছোঁয়া। কোথাও জমি চাষ ও সার দেওয়া হচ্ছে, কোথাও চারা রোপণ, আবার কোথাও চলছে আগাছা পরিষ্কার ও পরিচর্যা। মৌসুমের শুরুতেই সবজি বাজারে তুলে ভালো দাম পাওয়ার আশায় ব্যস্ত সময় কাটছে উপজেলার প্রান্তিক কৃষকদের।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, শসা, টমেটো, মুলা, লাউ, করলা, মরিচ, শিম, পটল, বরবটি, গাজর, পালংশাক, লালশাক ও ধনেপাতাসহ হরেক রকমের সবজিতে ভরে উঠেছে ফসলের মাঠ। রোদে পুড়ে কেউ চারার যত্ন নিচ্ছেন, কেউ দিচ্ছেন সার ও বালাইনাশক। যারা একটু পিছিয়ে পড়েছিলেন, তারাও জমি প্রস্তুত ও বীজ রোপণে তোড়জোড় শুরু করেছেন। কিছু জমির সবজি ইতিমধ্যে বাজারে উঠতেও শুরু করেছে।

কৃষকেরা জানান, অসময়ে বাজারে সবজির চাহিদা বেশি থাকায় আগাম চাষে দামও মেলে তুলনামূলক ভালো। গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় এবারও এ চাষে আগ্রহ বেড়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ধুনটে ১ হাজার ৬৮৬ হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৬৫১ হেক্টর। অর্থাৎ এবার লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ হেক্টর বেশি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রবি মৌসুম শুরুর পর এ পর্যন্ত ৩৩৮ হেক্টরের বেশি জমিতে সবজির আবাদ হয়েছে।

পাঁচথুপী গ্রামের কৃষক জহির উদ্দিন বলেন, মৌসুমের শুরুতেই সবজি বাজারে তুলতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যায়। এতে উৎপাদন খরচ মিটিয়ে কিছুটা লাভ থাকে। ১৫ শতক জমিতে টমেটো চাষ করেছেন তিনি। শুরুতে বৃষ্টিতে কিছু চারা নষ্ট হলেও এখন ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানান।

পারলক্ষীপুর গ্রামের আব্দুল মোমিন ৪০ শতক জমিতে বেগুন, শিম ও টমেটো চাষ করেছেন। তিনি বলেন, এ বছর বৃষ্টির কারণে আগাম চাষে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। বাড়তি পরিচর্যা করতে হয়েছে, খরচও বেশি পড়ছে। তবে অসময়ে এসব সবজির চাহিদা অনেক, তাই বেশি দামে বিক্রি করা যায়। এ কারণেই আমাদের আগ্রহ বেশি।

মথুরাপুর ইউনিয়নের বেলাল হোসেন একাধিক শীতকালীন সবজি চাষ করেছেন। তার ভাষ্য, গত বছর শুরুতে ভালো দাম পেলেও শেষ দিকে লোকসান গুনতে হয়েছিল। এবার আশা করছি শুরু থেকে শেষ পর্যন্তই ভালো দাম পাব।

কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, আগাম সবজি তুলতে পারলে ভালো দামের সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু জমি প্রস্তুত, সার, সেচ ও পোকামাকড় দমনে বাড়তি খরচ করতে হয়। প্রত্যাশিত দাম না পেলে লোকসানের শঙ্কাও থাকে।

এবার ১৮ শতক জমিতে করলার আবাদ করেছেন রিপন মিয়া। তিনি জানান, সার ও বীজ কিনতে খরচ হয়েছে ৭ হাজার টাকা, আর সুতা-বাঁশসহ অন্যান্য উপকরণে গেছে আরও ৯ হাজার। বাজারজাত করা পর্যন্ত মোট খরচ দাঁড়াতে পারে প্রায় ২০ হাজার টাকা। বাজারদর ভালো থাকলে ওই জমির করলা বিক্রি করে প্রায় ৬০ হাজার টাকা পাওয়ার আশা করছেন তিনি।

ধুনট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সামিদুল ইসলাম বলেন, বাজারে সবজির ভালো দাম থাকায় কৃষকেরা আগাম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন, যাতে সঠিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে ভালো ফলন পাওয়া যায় এবং আধুনিক পদ্ধতিতে কীটনাশকমুক্ত সবজি চাষ সম্ভব। কৃষকেরা যাতে লাভবান হন এবং কোনো সমস্যায় না পড়েন, সে জন্য আমরা সার্বক্ষণিক নজর রাখছি। কৃষকদের সুষম সার, জৈব সার ও কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শও নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

অনুকূল আবহাওয়া ও ন্যায্য বাজারদর বজায় থাকলে আগাম সবজি চাষ কৃষকদের আয় বাড়াতে সহায়ক হবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয় কৃষকদের। তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বাজারদরের ওঠানামা লাভের হিসাবে প্রভাব ফেলতে পারে, এমন শঙ্কাও রয়েছে। আপাতত অসময়ের বৃষ্টি ও পোকার আক্রমণ থেকে রেহাই পেলেই ভালো ফলনের স্বপ্ন দেখছেন ধুনটের কৃষকেরা।

আরও পড়ুন