আশেকে এলাহী শিবলী, ধুনট (বগুড়া)
প্রকাশ: ১৯:২৫, ৩ অক্টোবর ২০২৬
খাদেমের মতো হাজারো কৃষকের গল্প এখন বদলে দিচ্ছে বগুড়ার ধুনট উপজেলার কৃষি অর্থনীতির চেহারা। বাণিজ্যিকভাবে দিন দিন বাড়ছে উন্নত জাতের এই নেপিয়ার ঘাসের চাষ। বাজারে খড় ও কৃত্রিম গো-খাদ্যের বিকল্প হিসেবে এই ঘাসই এখন খামারিদের প্রধান ভরসা।
দিন দিন বিস্তার লাভ করছে উন্নত জাতের নেপিয়ার ঘাসের চাষ। একদিকে এই ঘাস বিক্রি করে বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন কৃষকেরা, অন্যদিকে খামারিরা পাচ্ছেন খড় ও কৃত্রিম গো-খাদ্যের তুলনায় অনেক সস্তা, সহজলভ্য ও পুষ্টিকর কাঁচা ঘাস। এই দুই পক্ষের চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যেই যেন গড়ে উঠছে একটি সমৃদ্ধ গ্রামীণ অর্থব্যবস্থা।
প্রথাগত ধান চাষের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি লাভ হওয়ায় অনেক কৃষক এখন ধান ছেড়ে মাঠের পর মাঠ ঘাস চাষের দিকে ঝুঁকছেন, আর সেই ঘাসই পৌঁছে যাচ্ছে এলাকার খামারগুলোতে পশুর নিয়মিত কাঁচা খাদ্য হিসেবে। স্থানীয় বাজারগুলোতেও সকাল-বিকাল আঁটি বেঁধে বাণিজ্যিকভাবে কেনাবেচা হচ্ছে এই ঘাস।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে গবাদিপশু রয়েছে প্রায় ২ লাখের বেশি আর ছোট-বড় মিলিয়ে গরু খামারী রয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার। এই বিপুল সংখ্যক গবাদিপশুর নিয়মিত কাঁচা ঘাষের চাহিদা মেটাতে গিয়ে এক সময় খামারিদের নির্ভর করতে হতো দানাদার খাবার বা বাজারের খড়ের ওপর, যা ছিল তুলনামূলক ব্যয়বহুল। নেপিয়ার ঘাসের চাষ বিস্তৃত হওয়ায় এখন সেই নির্ভরতা কমে এসেছে অনেকটাই। এসব গবাদিপশুর গো-খাদ্যের চাহিদা নিশ্চিত করতে উপজেলায় ব্যাপক হারে এই ঘাসের চাষ করছেন কৃষক ও খামারিরা।
সরেজমিনে উপজেলার চৌকিবাড়ি, কালেরপাড়া, চিকাশী, নিমগাছি, গোপালনগরসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, যে জমিতে ধান চাষের কথা, সেখানে এখন ঘাসের প্রাধান্য। রাস্তার ধারেও কৃষকেরা এখন এই ঘাস আবাদ করছেন। শনিবার উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায় কৃষকদের কর্মব্যস্ততা,নির্ধারিত সময়ে জমি থেকে ঘাস কেটে কেউ ভ্যানগাড়ি-ভটভটিতে চাপিয়ে ছুটছেন হাট-বাজারের দিকে, কেউ আবার সরাসরি পৌঁছে দিচ্ছেন পরিচিত খামারে।
নেপিয়ার ঘাস চাষে পরিশ্রম কম। এর চারা একবার জমিতে লাগালে ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে নতুন করে লাগাতে হয় না। পুষ্টিকর এই ঘাসে দেহ গঠনকারী আমিষ উপাদানসহ প্রায় সর্বপ্রকার পুষ্টি উপাদান মজুত থাকে। ফসল তুলে ফসল চাষের কারণে দিন দিন জমিতে প্রাকৃতিকভাবে ঘাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এই উন্নত জাতের ঘাস চাষের প্রতি ঝুঁকছেন কৃষক-খামারিরা। গবাদিপশুর খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে কৃষকরা বাজারে বিক্রি করে আর্থিকভাবেও লাভবান হচ্ছেন। অনেকে জমির আইল, পুকুর-জলাশয়ের ধার বা বাড়ির পাশের পতিত জমিতেও ঘাস চাষ করছেন।
জানা যায়, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে প্রথম ভারত থেকে নেপিয়ার ঘাস নিয়ে আসা হয়। পরে বিভিন্ন সময় উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের পরামর্শ ও কাটিং বিতরণের মাধ্যমে খামারিদের মাঝে এর বিস্তার ঘটে। ভিটামিন 'এ' সমৃদ্ধ এই ঘাস গবাদিপশুর প্রিয় খাদ্য হয়ে ওঠায় দিন দিন বেড়েছে এর চাহিদা।
চৌকি বাড়ী ইউনিয়নের পাঁচথুপী গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ খাদেম আলী জানান, অন্যান্য ফসলের তুলনায় নেপিয়ার ঘাসের উৎপাদন খরচ অনেক কম এবং জমিতে একবার ঘাস লাগালে ৪০-৪৫ দিন পরপর কাটা যায়, বছরে ৫-৬ বার। মাঝেমধ্যে একটু নিড়ানি ও সার দিলেই চলে। এক বিঘা জমি থেকে বছরে প্রায় এক লাখ টাকার ঘাস বিক্রি করা যায়। অনেক সময় খামারিরাই জমি থেকে ঘাস নিয়ে যান, আমি নিজেও প্রতিদিন বিভিন্ন খামারে ঘাস পৌঁছে দিয়ে আসি," বলেন তিনি।
কীভাবে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা জানতে চাইলে খাদেম বলেন, ১০-১২ বছর আগে প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে কাটিং এনে জমি বর্গা নিয়ে প্রথম শুরু করেন তিনি। এরপর তাকে দেখে এলাকার কৃষকরাও অন্য ফসলের পরিবর্তে ঘাস চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। এক সময় হতদরিদ্র দিনমজুর ছিলেন খাদেম, ক্ষুধা-দারিদ্র্য আর ঋণে জর্জরিত ছিল সংসার। শুধু ঘাস চাষ করে গত ১০-১২ বছরে জমি কিনেছি, বাড়ি করেছি, সংসারে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে তার। এখন প্রায় ২০ বিঘা জমিতে নেপিয়ার ও সুপার নেপিয়ার জাতের ঘাস চাষ করেন তিনি।
এছাড়াও উপজেলার মথুরাপুর হুকুম আলী বাসস্ট্যান্ড, গোসাইবাড়ি, গোপালনগরের বিভিন্ন হাটে পাইকারি, খুচরা দরে এই ঘাস বিক্রি হয়।
গোপালনগরের ঘাসচাষি মোহাম্মদ শামীম বলেন, বাংলাদেশের অন্য যে কোনো ফসলের তুলনায় ঘাসের চাষ কম ব্যয়বহুল। কোনো কীটনাশক লাগে না, সেচও কম লাগে। একবার কোনো জমিতে ঘাস লাগালে পরের টানা দুই বছর, ভাগ্য ভালো হলে তিন বছর পর্যন্ত কাটা যায়।এক বিঘা জমি থেকে প্রতি দেড় মাসে প্রায় তিন হাজার আঁটি ঘাস কাটা যায়, যার বাজারমূল্য ২০-৩০ হাজার টাকা (প্রতি আঁটি ১০-১৫ টাকা)। বছরে এভাবে ৫-৬ বার কাটা সম্ভব। প্রতি বিঘায় বছরে খরচ ২৫-৩০ হাজার টাকা, লাভ এক থেকে দেড় লাখ টাকা।
মথুরাপুর ইউনিয়নের কৃষক রাসেল বলেন, আগে ভুসি-খৈল খাওয়াতে গিয়ে লাভের গুড় পিঁপড়ে খেয়ে যেত। গত বছর থেকে এক বিঘা জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ শুরু করায় গরুর খাবারের খরচ অর্ধেক হয়ে গেছে, দুধও বেড়েছে। একইভাবে আবুল কালাম ১০ শতক জমিতে ঘাস চাষ করে নিজের পাঁচটি গরুর চাহিদা মিটিয়ে কিছু ঘাস বিক্রিও করছেন, আর বিল্লাল হোসেন এক বিঘা জমির ঘাস থেকে নিজের পশুর খাদ্য পূরণের পর বাকিটা বিক্রি করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন।
শরামবাড়ী দারুল হুদা কওমি হাফিজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ও খামারি মাওলানা মহিবুল্লাহ শাফি বলেন, দেশে ডেইরি শিল্পের বিপ্লব ধরে রাখতে হলে নেপিয়ার ঘাসের মতো উন্নত জাতের সবুজ ঘাস চাষের কোনো বিকল্প নেই। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কাটিং সরবরাহ আরও সহজলভ্য করা গেলে এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে। নেপিয়ার ঘাস চাষে একদিকে যেমন পশুর পুষ্টির চাহিদা মেটানো যাচ্ছে, অন্যদিকে খামারিদের উৎপাদন খরচ কমে আসছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
কৃষকরা বলছেন, ধান বা অন্য ফসলের তুলনায় এই ঘাস চাষে সার, কীটনাশক ও মজুরি খরচ অনেক কম লাগে। একবার চারা রোপণ করলে ২ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত লাভবান হওয়া যায়। অল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে এভাবেই লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা, আর এর সুফল সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে খামারিদের কাছেও,গবাদিপশুর খাদ্য সংকট কমছে, বাড়ছে দুধ উৎপাদন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোছাঃ রেহেনা খাতুন বলেন, বর্তমানে প্রাকৃতিক ঘাসের চরণভূমি না থাকায় গবাদিপশু দানাদার খাবারনির্ভর হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এই ঘাস চাষ হওয়ায় পশুর কাঁচা ঘাসের চাহিদা নিয়মিত মিটছে। তিনি জানান, এই ঘাস খেলে পশুর স্বাস্থ্য, দুধ উৎপাদন ও সঠিক সময়ে বাচ্চা প্রসবসহ বিভিন্ন উপকারিতা রয়েছে, যে কারণে খামারিরা নিয়মিত পশুর খাদ্য তালিকায় এই ঘাস রাখেন।
এছাড়াও নেপিয়ার ঘাস দ্রুত বাড়ে। সাধারণ ঘাসের তুলনায় নেপিয়ারে প্রোটিন ও ফাইবারের পরিমাণ অনেক বেশি, যা গাভীর দুধ উৎপাদন বাড়াতে এবং গবাদিপশুর দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধিতে সহায়ক।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার প্রায় প্রতিটি কৃষক পরিবারেই কমবেশি এই ঘাসের চাষ হয়। আর এই চাষের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে এলাকার কৃষক ও খামারিদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, ধুনট উপজেলায় ২০২৫ সালে ৩০১ হেক্টর জমিতে নেপিয়ার ঘাসের চাষাবাদ হয়েছে। মাঠের পর মাঠ এই সবুজ ঘাসই যেন আজ ধুনটের কৃষি অর্থনীতির নতুন এক অধ্যায় লিখে চলেছে।