ভেজাল পানির প্রতিবেদন প্রকাশের পর সীতাকুন্ডে সাংবাদিক গ্রেপ্তার

মোঃ সাকিব চৌধুরী,  সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)

প্রকাশ: ২০:০৩, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

ভেজাল পানির প্রতিবেদন প্রকাশের পর সীতাকুন্ডে সাংবাদিক গ্রেপ্তার

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানার বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে সাইবার সুরক্ষা আইনে করা একটি মামলায় তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, পুলিশের ভূমিকা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জয়নাল আবেদীন দৈনিক জনবাণী পত্রিকার সংবাদকর্মী এবং বাংলাদেশ সাংবাদিক উন্নয়ন সংস্থার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২ অক্টোবর তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ছদ্মবেশে মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানায় কাজ শুরু করেন জয়নাল। সেখানে পানির বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ভেজাল এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করেন তিনি। পরে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিবেদনটি একাধিক গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেদন প্রকাশের পর মুসকান কর্তৃপক্ষ তাঁকে ডেকে নেয় এবং লিখিত অভিযোগ ছাড়াই পুলিশকে খবর দেয়। এরপর সীতাকুণ্ড থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নুর উল্লাহ তাঁকে গ্রেপ্তার করেন। সাংবাদিক জয়নালের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও গ্রেপ্তারের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরে সীতাকুণ্ড থানার ৫৬ নম্বর মামলায় সাইবার সুরক্ষা আইনে তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়। তবে মামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, গ্রেপ্তারের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার বিস্তারিত স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় তথ্য সংগ্রহের জন্য ছদ্মবেশ ধারণের পদ্ধতি কখনো কখনো ব্যবহৃত হয়। তবে এ ধরনের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা যাচাই ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে কোনো অভিযোগ উঠলে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এদিকে, মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটারের মূল প্রতিষ্ঠান এস এ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শাহাবুদ্দিন আলম অতীতে ঋণসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ঋণসংক্রান্ত একাধিক মামলা ও আইনি পদক্ষেপের খবরও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৮ সালে ঋণসংক্রান্ত অভিযোগে সিআইডি তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়। ২০২৩ সালে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। এসব অভিযোগের বর্তমান আইনি অবস্থা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার প্রকৃত অভিযোগ, তাঁর গ্রেপ্তার ও থানায় রাখার আইনি ভিত্তি এবং মুসকান কারখানার বোতলজাত পানির মান নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য—সবকিছুই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য প্রকাশ গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অভিযুক্তের বক্তব্য গ্রহণও সাংবাদিকতার অংশ। এ ঘটনায় সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলার আইনগত ভিত্তি ও কারখানার পানির মান নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি সামনে এসেছে।

আরও পড়ুন