চকরিয়ায় প্যারাবন উজাড় করে চিংড়িঘের তৈরির হিড়িক

মোস্তফা আঞ্জুম ফাহিম, চকরিয়া (কক্সবাজার)

প্রকাশ: ১৯:৩৮, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

চকরিয়ায় প্যারাবন উজাড় করে চিংড়িঘের তৈরির হিড়িক

কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক ‘চকরিয়া সুন্দরবন’ আবারও প্যারাবন নিধনের কবলে পড়েছে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্যারাবন কেটে নতুন নতুন চিংড়িঘের গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। এতে অবশিষ্ট ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, চকরিয়া সুন্দরবনের অবশিষ্ট প্যারাবন কেটে বিভিন্ন স্থানে চিংড়িঘের তৈরি করা হচ্ছে। চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার চরণদ্বীপ, রামপুর, সওদাগরঘোনা, সাহারবিল ও বদরখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি প্যারাবন নিধনের এ তৎপরতা বেড়েছে।

উপকূলীয় এলাকার স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় জনপদকে সুরক্ষা দিয়ে আসছিল এই ম্যানগ্রোভ বন। কিন্তু অবৈধ ইজারা ও অনিয়ন্ত্রিত চিংড়িঘের স্থাপনের কারণে উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন এই বন দ্রুত বিলীন হয়ে গেছে।

তাঁরা জানান, একসময় এই বনে সুন্দরী, কেওড়া, বাইন ও গেওয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ছিল। বনটি ছিল হরিণ, বনবিড়াল, বাঘসহ নানা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। বন ধ্বংসের ফলে শুধু জীববৈচিত্র্যই নয়, উপকূলের পরিবেশগত ভারসাম্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯০৩ সালে চকরিয়া সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯২৬ সালের দিকে বনাঞ্চলে বসতি স্থাপন শুরু হয়। ওই সময় কৃষিকাজের জন্য প্রায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমি ইজারা দেওয়া হয়। অভিজ্ঞ মহলের মতে, সেখান থেকেই বন ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের দিকে প্রায় ২১ হাজার একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বনের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার একর জমি সংরক্ষিত ছিল। বাকি অংশ বসতি স্থাপন ও কৃষিকাজের জন্য ইজারা দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ১৯৮০ সালের দিকে বাণিজ্যিকভাবে চিংড়ি চাষের বিস্তার ঘটতে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বনভূমি দখল করে চিংড়িঘের নির্মাণ করা হয়। এভাবে ক্রমাগত বন উজাড়ের ফলে ম্যানগ্রোভ বনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের মুখে পড়ে।

চিংড়িঘের তৈরির জন্য কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ করে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত করা হয়। কোথাও কোথাও লবণাক্ত পানি ঢুকিয়ে ঘের তৈরি করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তবে বনাঞ্চলটির তদারকি ও ব্যবস্থাপনায় উপকূলীয় বন বিভাগের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাহারবিল ও বদরখালী ইউনিয়নের একাধিক বাসিন্দা বলেন, প্যারাবন কেটে চিংড়িঘের তৈরি করা ব্যক্তিদের অনেকে সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং তাঁরা প্রভাবশালী। এ কারণে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁরা নির্বিঘ্নে পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ তাঁদের।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে প্যারাবন নিধন অব্যাহত থাকলে উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক সুরক্ষা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের পানির আঘাতে জনপদ, বসতবাড়ি ও কৃষিজমি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

চকরিয়া সুন্দরবন রক্ষায় উচ্চ আদালতের আইনি পদক্ষেপের বিষয়টিও সামনে এসেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) পক্ষ থেকে বনাঞ্চলটি রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে চকরিয়া সুন্দরবনের ২১ হাজার একরেরও বেশি সংরক্ষিত বনভূমিতে দেওয়া সব ধরনের অবৈধ ইজারা কেন বাতিল ঘোষণা করা হবে না এবং অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন আদালত।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আদালতের নির্দেশনা ও প্রচলিত আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ ইজারা বাতিল এবং প্যারাবন নিধন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, চকরিয়া সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই বনাঞ্চল রক্ষায় সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগে অবশিষ্ট প্যারাবন রক্ষা পাবে এবং অবৈধ দখল ও চিংড়িঘের নির্মাণ বন্ধের মাধ্যমে ঐতিহাসিক চকরিয়া সুন্দরবনকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন