আলমগীর হোসেন ফয়সাল, রায়পুর (লক্ষ্মীপুর)
প্রকাশ: ১৯:৫৮, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় এ বছর পানের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে দাম কমে যাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন চাষিরা। গত বছর যে পরিমাণ পান ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, এ বছর তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪০ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পানের দাম কমেছে প্রায় ৬৭ শতাংশ। এতে উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন পানচাষিরা।
উপজেলার ঐতিহ্যবাহী হায়দরগঞ্জ বাজারে পানের এমন দরপতনের চিত্র দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ বাজারে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকার পান কেনাবেচা হয়। মধ্যরাত থেকে বিভিন্ন এলাকার চাষিরা পান নিয়ে বাজারে আসেন। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত চলে জমজমাট পাইকারি বেচাকেনা। তবে বাজারে পানের সরবরাহ বেশি থাকলেও প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় চাষিদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা।
পান বিক্রি করতে এসে নিজের দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন স্থানীয় চাষি সাহেদ মাঝী। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “এত কষ্ট করে পান বাজারে নিয়ে এসে বিক্রি করেও বলদের (পরিবহন খরচের) পয়সা উঠবে না।” তাঁর এ বক্তব্যে পান উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ব্যয়ের তুলনায় বিক্রয়মূল্য কমে যাওয়ার চিত্র ফুটে উঠেছে।
স্থানীয় চাষিদের ভাষ্য, এ বছর পানগাছে রোগ ও পচনের প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। ভালো ফলনের কারণে বাড়তি আয়ের আশা করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। ফলে উৎপাদন ভালো হলেও আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারছেন না অনেক চাষি।
চাষিদের জমি প্রস্তুত ও পরিচর্যা, সার, সেচ, শ্রমিকের মজুরি, পান সংগ্রহ এবং পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয় করতে হয়। উৎপাদিত পান দ্রুত বাজারজাত করতে হয় বলে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করে ভালো দামের অপেক্ষা করার সুযোগও সীমিত। তাই কম দামে পান বিক্রি করতে বাধ্য হলে উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের ক্ষেত্রে।
আরেক চাষি বারেক উদ্দিন জানান, রায়পুরের হায়দরগঞ্জ বাজারে নিয়মিত পানের হাট বসে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে পান কিনতে আসেন। দীর্ঘদিন ধরে এ বাজারকে কেন্দ্র করে চাষি, পাইকারি ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। তবে বাজারে বেচাকেনা ভালো হলেও উৎপাদক পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে চাষিদের সংকট কাটবে না।
রায়পুরের নতুন বাজার পানহাটা, হায়দরগঞ্জ বাজার ও ক্যাম্পেরহাট পানের কেনাবেচার পরিচিত কেন্দ্র। এসব বাজার থেকে হাতিয়া, চট্টগ্রাম, ফেনী ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পান সরবরাহ করা হয়। ফলে পান চাষের সঙ্গে স্থানীয় কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবহন খাতের বহু মানুষের জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে।
চাষিদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন ধরে পানের দাম এভাবে কম থাকলে ভবিষ্যতে পান চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন অনেকে। উৎপাদন খরচ বাড়ার বিপরীতে বিক্রয়মূল্য কমে গেলে কৃষকের আর্থিক ক্ষতি বাড়বে। এতে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে পানচাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজারদর পর্যবেক্ষণ, উৎপাদক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় এবং বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা উন্নত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, উৎপাদন বাড়ার সুফল কৃষকের ঘরে পৌঁছাতে হলে পান বিক্রির ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।
পানের বাম্পার ফলন যেখানে কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর কথা, সেখানে দাম কমে তিন ভাগের এক ভাগে নেমে আসায় দেখা দিয়েছে হতাশা। এখন চাষিদের বড় দুশ্চিন্তা, পান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় মিটিয়ে আদৌ লাভের মুখ দেখা সম্ভব হবে কি না।