এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৯:০৭, ৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২২:১৮, ৮ অক্টোবর ২০২৬
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে ডিপি ওয়ার্ল্ডের এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দুপুর ৩টা ৪০ মিনিটে অনুষ্ঠিত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ঈসা কাজিম চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তি অনুযায়ী, নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ডিপি ওয়ার্ল্ড আগামী ১৫ বছর এনসিটি পরিচালনা করবে। তবে বিদেশী অপারেটরের কাছে টার্মিনাল হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান ব্যবস্থায় চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেডের মাধ্যমে এনসিটির কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দায়িত্ব দেয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) এবং সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) কাঠামোর আওতায় এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া হয়।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিষয়টি দর-কষাকষির পর্যায়ে পৌঁছায়। কিন্তু শ্রমিকদের আন্দোলন এবং আলোচনা কমিটির কয়েকজন সদস্যের আপত্তির কারণে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রক্রিয়াটি স্থগিত হয়ে যায়। এ নিয়ে বন্দর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আবারো ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আলোচনা শুরু হয়। সর্বশেষ গত জুনে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে দর-কষাকষি চালিয়ে যাওয়ার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়। এরপর ধারাবাহিক আলোচনা ও দর-কষাকষির মাধ্যমে চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর প্রধান চারটি টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড়। বন্দরের কনটেইনার পরিবহন সক্ষমতা ও কার্যক্রমে এ টার্মিনালের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
বন্দর সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ অর্থবছরে এনসিটির মাধ্যমে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার (টিইইউ) ওঠানো-নামানো হয়েছে। এটি চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ। ফলে এনসিটির পরিচালনা ব্যবস্থায় পরিবর্তন বন্দরের সামগ্রিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেডের মাধ্যমে এনসিটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে টার্মিনাল হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান অপারেটরই টার্মিনাল পরিচালনা করবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে এনসিটি ছাড়াও রয়েছে আরো তিনটি প্রধান টার্মিনাল। এর মধ্যে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এবং চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) দেশীয় অপারেটরদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনা করছে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই)। ফলে এনসিটির দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলোতে বিদেশী অপারেটরের অংশগ্রহণ আরো বাড়ছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টার্মিনাল পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ডের। এনসিটির মতো বৃহৎ কনটেইনার টার্মিনালে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত জাহাজ ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরকে আরো কার্যকর ও দক্ষ করার ক্ষেত্রে আধুনিক টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিদেশী অপারেটরের সাথে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আর্থিক ও অন্যান্য শর্ত, বন্দরের স্বার্থ, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং রাজস্ব প্রাপ্তির বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তরের পর টার্মিনালের অপারেশনাল কার্যক্রম, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং বন্দরের রাজস্ব কাঠামোয় কী ধরনের পরিবর্তন আসে, সেটিই এখন সংশ্লিষ্টদের নজরে রয়েছে।
চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে এলেও বাস্তবে দায়িত্ব হস্তান্তর, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং নতুন অপারেটরের কার্যক্রম শুরুর বিষয়গুলো সম্পন্ন হওয়ার পরই এর পূর্ণ প্রভাব স্পষ্ট হবে।