কক্সবাজারে এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়, পাসের হার ৪৩.৯৩ শতাংশ

রিয়াজ উদ্দিন, কক্সবাজার

প্রকাশ: ১০:২৫, ১ নভেম্বর ২০২৬

কক্সবাজারে এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়, পাসের হার ৪৩.৯৩ শতাংশ

কক্সবাজার জেলায় ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় বড় ধরনের ফল বিপর্যয় ঘটেছে। গত ১৩ বছরের মধ্যে এবারই জেলায় সর্বনিম্ন পাসের হার রেকর্ড হয়েছে। মাত্র ৪৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। একই সঙ্গে আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা। গত বছর ২০৬ জন জিপিএ-৫ পেলেও এবার পেয়েছে মাত্র ৫৩ জন।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ফলাফলে দেখা যায়, জেলার ২৬টি কলেজের মধ্যে ১৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেনি। বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করেনি। অন্যদিকে শতভাগ পাসের সাফল্য অর্জন করেছে জেলার একমাত্র প্রতিষ্ঠান রামু ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। কয়েকজন এইচএসসি পরীক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের ফলাফল নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নয়। এসব বিষয়ে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছে তারা।

এদিকে, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সামগ্রিক ফল বিপর্যয়ের পেছনে ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ের উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। তাঁদের মতে, এসব বিষয়ে পরীক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্ত নম্বরের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। ফলে খাতা মূল্যায়নের পদ্ধতি, নম্বর প্রদানের স্বচ্ছতা এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

শুধু এইচএসসি নয়, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল। বোর্ড চ্যালেঞ্জের পর উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণে আবেদনকারীদের অনেকের ফলাফলে পরিবর্তন আসে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নতুন করে উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতির নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

 সংশ্লিষ্টদের মতে, এসএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণের অভিজ্ঞতা এবং এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ের ফল নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ—দুটি বিষয়ই গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় অমনোযোগিতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে পড়ালেখা করেনি।

কক্সবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল হাসনাত মো. মফিজুল হক বলেন, এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এর পেছনে পড়াশোনায় অমনোযোগিতা, নিয়মিত অধ্যয়ন ও পরীক্ষার প্রস্তুতির ঘাটতিসহ বিভিন্ন বিষয় কাজ করতে পারে। তাঁরা ফলাফল পর্যালোচনা করছেন।

উত্তরণ মডেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর এ কে এম ফজলুল করিম চৌধুরী বলেন, ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিতি। অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত উপস্থিত না থাকায় পাঠ্যবিষয়ে যথাযথ ধারণা তৈরি হয়নি। ফলে পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও ঘাটতি থেকে গেছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী করার পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা ও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। নিয়মিত পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন কঠিন হবে।

কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আ. ন. ম. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন ও শিক্ষার মানোন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নতুন শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা ও যোগ্যতা মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উত্তরপত্র মূল্যায়নে নিরপেক্ষতা ও মানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা শিক্ষার স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থা থেকে নতুন ধারায় মানিয়ে নিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কিছুটা সময় প্রয়োজন। পাশাপাশি নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি, পড়াশোনায় মনোযোগ ও শিক্ষকদের আন্তরিকতা নিশ্চিত করা গেলে আগামীতে ফলাফলের উন্নতি সম্ভব।

এক বছরে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা ২০৬ থেকে ৫৩-তে নেমে আসা এবং অধিকাংশ কলেজে কোনো শিক্ষার্থীর জিপিএ-৫ না পাওয়া জেলার শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে একটি প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থী পাস না করায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও সার্বিক শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ফল বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম জোরদার, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোরও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণ এবং বিষয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে জেলার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং আগামীতে ভালো ফলাফল নিশ্চিত করার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন