দেবদাস বিশ্বাস, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ: ১২:৩৭, ৭ নভেম্বর ২০২৬
নুরুল করিম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন নীলফামারী সরকারি কলেজে। শুরুতে এ পেশায় আগ্রহী ছিলেন না। ক্যাডার পরিবর্তনের জন্য আবারও বিসিএস দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বদলে যায় তার ভাবনা। শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের বাইরেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সময় দিতে শুরু করেন তিনি। সেই উদ্যোগই একসময় অনেক শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতির ভরসা হয়ে ওঠে।
শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাদানের অনুপ্রেরণা
নুরুল করিমের জন্ম বরিশালের হিজলা উপজেলার পূর্ব কৃষ্ণপুর গ্রামে। নদীবেষ্টিত প্রত্যন্ত এই গ্রামের কৃষক বাবার সংসারে দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় শিক্ষকদের কাছ থেকে বিনা মূল্যে বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি। সকাল থেকে বিকেল, কখনো রাতেও শিক্ষকরা তাকে পড়াতেন। শিক্ষকদের সেই সহযোগিতা পরবর্তী সময়ে নিজের কাজের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
২০১২ সালে ফয়সাল মাহদী সবুজকে পড়ানোর মধ্য দিয়ে বিনা মূল্যে শিক্ষাদানের উদ্যোগ শুরু করেন নুরুল করিম। সবুজ এখন বাংলাদেশ পুলিশের সার্জেন্ট। এরপর নিজের সরকারি বেতনে সংসার চালিয়ে শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। শুরুতে শিক্ষার্থীরা ক্লাস শেষে তার বিভাগের কক্ষে এসে পড়ত। প্রচলিত কোচিংয়ের মতো নির্দিষ্ট ফি নিয়ে পড়ানোর ব্যবস্থা ছিল না।
করোনায় উঠানে শুরু পাঠশালা
করোনার সময় কলেজ বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে রাখাই হয়ে ওঠে চ্যালেঞ্জ। তখন শিক্ষার্থীদের বাড়ির উঠানে মাদুর বিছিয়ে পড়াতেন নুরুল করিম। কখনো ছাদে, কখনো মাঠে বসেও চলত পাঠদান। সেখান থেকেই পরিচিতি পায় ‘উঠান পাঠশালা’ নামটি। তার কোচিংয়ের নাম ছিল ‘ড্রিম টু ডিইউ’। মূলত নীলফামারী সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরাই তার কাছে পড়ত।
নুরুল করিমের হিসাবে, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেত। কোনো কোনো বছর এ সংখ্যা ৬০ ছাড়িয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর গড়ে ১২ থেকে ১৩ জন শিক্ষার্থী সুযোগ পেয়েছে বলে জানান তিনি। ২০১৭ সালের একটি ব্যাচ থেকে প্রায় ১৬ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। আর ২০২৩ সালের ব্যাচে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েছিল ৬০ জনের বেশি শিক্ষার্থী। তবে এসব সাফল্যের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান তার কাছে নেই
ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্যের গল্প
নুরুল করিমের কাছে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মো. ফরিদুলের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ৯৪ দশমিক ২০ নম্বর পেয়ে মেধাতালিকায় প্রথম হন ফরিদুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায়ও তিনি ১০৬তম হয়েছিলেন। এ ফলাফলের স্ক্রিনশট নুরুল করিমের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
শুধু প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়েই থেমে থাকেননি তিনি। তাদের আবার চেষ্টা করতে উৎসাহ দিতেন। কেউ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরও শ্রেণিকক্ষে দেখা হলে দ্বিতীয়বার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলতেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এমন অনেক শিক্ষার্থী পরেরবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে।
শুধু তাই নয়, পড়াশোনার খরচ জোগাতে না পেরে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে দিতে চাইত, তাদের সহায়তার চেষ্টা করেছেন নুরুল করিম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পর অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা পরিষদ ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে সহায়তা সংগ্রহ করেছেন। একটি মেয়ের জন্য দেড় লাখ টাকা সহায়তা জোগাড় করার কথাও জানান তিনি।
এসব অর্থের কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব অবশ্য তার কাছে নেই। দাতারা সরাসরি শিক্ষার্থীদের হাতে টাকা দিতেন। ফলে কতজন শিক্ষার্থী কী পরিমাণ সহায়তা পেয়েছে, তার সামগ্রিক হিসাব সংরক্ষিত হয়নি।
বিনা মূল্যে পড়ানো নিয়ে আপত্তি
শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পড়ানোর কারণে সহকর্মীদের আপত্তির মুখেও পড়তে হয়েছে নুরুল করিমকে। তার অভিযোগ, একপর্যায়ে কলেজের তৎকালীন ভাইস প্রিন্সিপাল তাকে বাসায় ডেকে পড়ানো বন্ধ করতে।
শিক্ষার্থীরাও হয়ে উঠেছেন অন্যদের শিক্ষক
নুরুল করিমের কাছে পড়াশোনা শুধু ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার কাছে পড়া আবির, রাকিব, ইভান ও বাদশাহ ছুটিতে বাড়ি এলে অন্য শিক্ষার্থীদের পড়াতেন। তাদের মধ্যে প্রথম দুজন এখন চাকরি করছেন। এভাবে তার শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে অন্যদের পড়াশোনায়ও সহযোগিতা করেছেন। বলেন। শিক্ষার্থীদের কাছে তার সুনাম বাড়ছে—এমন কারণ দেখিয়ে তাকে বদলির হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি। তবে ঘটনাটি নিয়ে বিস্তারিত বলতে চান না নুরুল করিম।
এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তৎকালীন ভাইস প্রিন্সিপালের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে পদায়নের পর প্রায় এক বছর ধরে নুরুল করিমের নিজের এই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
স্বীকৃতি নয়, কাজ চালিয়ে যেতে চান
নিজের উদ্যোগের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক পুরস্কার বা স্বীকৃতি পাননি নুরুল করিম। স্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র গড়ার পরিকল্পনাও নেই তার। যত দিন ভালো লাগবে, তত দিন এ ধরনের কাজ করে যেতে চান তিনি।
নুরুল করিমের কাছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বাধাগুলোর একটি হলো উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার অভাব। নীলফামারীতে তার কাছে পড়া শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং কর্মজীবনে প্রবেশের গল্পগুলোই এখন পর্যন্ত এই উদ্যোগের সবচেয়ে দৃশ্যমান ফল।