বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: ১১:২২, ২০ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১১:২৩, ২০ অক্টোবর ২০২৬
গ্যাংস্টার অনিল পণ্ডিতের একটি অডিও রেকর্ডিং ছড়িয়ে পড়েছে। অস্পষ্ট কণ্ঠে তিনি বলছেন, ‘সালমান খানকে ক্ষমা চাইতে হবে।’ এই গুলির দায়ও তিনি নিয়েছেন।
বিরোধের শুরু ১৯৯৮ সালে। তখন রাজস্থানের যোধপুরে ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ ছবির শুটিং চলছিল। সালমান সেখানে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে তিন সপ্তাহ ছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি যোধপুরের গ্রামাঞ্চলে শিকারে গিয়েছিলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বরের রাতে তিনি ভাবাদ গ্রামে দুটি চিঙ্কারা হরিণ মারেন। মামলাটি বিচারিক আদালতে যায়। পরে রাজস্থান হাইকোর্ট তাকে খালাস দেয়। ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বরের রাতে লুনির ঘোড়া ফার্মে আরও দুটি চিঙ্কারা মারার অভিযোগ ওঠে। এই মামলার রায়ও ২০১৬ সালে রাজস্থান হাইকোর্ট বাতিল করে।
সবচেয়ে গুরুতর ছিল কৃষ্ণসার হরিণ মারার ঘটনা। এটি বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী। অভিযোগ, ১ ও ২ অক্টোবরের রাতে কানকানি গ্রামে দুটি কৃষ্ণসার মারা হয়। এ ঘটনায় ২০১৮ সালে সালমানকে পাঁচ বছরের সাজা দেওয়া হয়। সাজার বিরুদ্ধে তার আপিল এখনো বিচারাধীন।
ওই রাতে ছবির সহশিল্পী নীলম, তাবু, সোনালি বেন্দ্রে ও সইফ আলি খানও তার সঙ্গে ছিলেন। তারা মামলায় সহ-অভিযুক্ত। বিচারিক আদালত তাদের খালাস দিয়েছে। কিন্তু সরকার খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। সেই মামলাও বিচারাধীন।
বিষ্ণোই সম্প্রদায় পরিবেশ ও প্রাণীকে পবিত্র মনে করে। যোধপুরের গ্রামাঞ্চলে তারা বসবাস করে। তাদের বিশ্বাসে ২৯টি নিয়ম আছে। মারোয়ারি ভাষায় বলা হয় ‘বিশ নয়, নৌ নিয়ম’। এই দুটি সংখ্যা মিলেই ‘বিষ্ণোই’ শব্দ এসেছে। এই নিয়মগুলোর একটি হলো অহিংসা এবং প্রাণী, পাখি ও পরিবেশ রক্ষা।
বিষ্ণোইরা কৃষ্ণসার ও চিঙ্কারা হরিণের কট্টর রক্ষক। তারা মনে করে, একজন বড় তারকা তাদের এলাকায় খোলাখুলি হরিণ শিকার করেছেন। যে জায়গায় শুটিং করতে এসেছিলেন, তার প্রতি তার কোনো সম্মান ছিল না। তাই সম্প্রদায়ের ক্ষোভ ছিল তীব্র।
১ ও ২ অক্টোবরের রাতে তারা সালমানকে অনুসরণ করে বলে ধারণা করা হয়। কানকানির বিষ্ণোই গ্রামের লোকজন গুলির শব্দ শুনে ছুটে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, সালমানের গাড়ির পিছনেও তারা ধাওয়া করে। বন বিভাগের কাছে মামলাও করে। এরপর ২০ বছর ধরে চলা আইনি লড়াইয়ে তারা সাক্ষী হয়।
বিষ্ণোইরা যোধপুরের রাস্তায়, আদালতে ও থানার সামনে আন্দোলন করেছে। তাদের চাপেই মামলাটি গণমাধ্যমের নজরে আসে। কর্তৃপক্ষের ওপরও চাপ ধরে রাখা সম্ভব হয়। বন বিভাগ সালমান ও অন্যদের বিরুদ্ধে শিকারের মামলা করে। সম্প্রদায় সেখানেই থামেনি। তারা নিজেদের একজন আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে যোধপুরের ধুলোমাখা আদালতে ২০ বছর মামলার তদারকি করেছে।
২০ বছর ধরে সম্প্রদায়ের হয়ে আদালতে লড়া আইনজীবী মহীপাল বিষ্ণোই বলেন, ‘সম্প্রদায় যদি এই মামলা এত কাছ থেকে অনুসরণ না করত, তাহলে আমরা এতে সাজা দেখতাম না। সালমান দুটি কৃষ্ণসার শিকারের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। মামলাটি এখন বদলির আবেদনের মাধ্যমে হাইকোর্টে গেছে। কিন্তু বিষ্ণোই সম্প্রদায় সক্রিয়ভাবে এর ওপর নজর রেখেছে। আমি নিজে ২০ বছর সম্প্রদায়ের হয়ে লড়েছি।’
লরেন্স বিষ্ণোইয়ের এই গল্পে আসা অনেক পরে। ২০১৮ সালে যোধপুরের একটি আদালতে অন্য একটি চাঁদাবাজির মামলায় তাকে হাজির করা হয়। আদালত থেকে বের হওয়ার সময় বাইরে অপেক্ষারত টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে তিনি বলেন, ‘সালমান খানকে এই যোধপুরেই মারা হবে, তখন সে আমাদের আসল পরিচয় বুঝতে পারবে।’ সেই মুহূর্তটিই লরেন্সকে ভারতজুড়ে পরিচিতি এনে দেয়।
জেলে থাকা এই গ্যাংস্টার বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েছেন। এই মামলায় দ্রুত বিচারের কোনো লক্ষণ ছিল না। লরেন্স নিজেকে ধর্মের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরে। এক সুপারস্টারকে হুমকি দিয়ে তিনি জাতীয় শিরোনামও হন। ১৯৯৮ সালে যোধপুরে শিকারের মামলা শুরু হওয়ার সময় লরেন্স ছিলেন নাবালক। তিনি তখন পাঞ্জাবে নিজের বাড়িতে থাকতেন। তবু একটি আলোচিত ও গভীর সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের মামলাকে ব্যবহার করে তিনি অপরাধ জগতে নিজের আধিপত্য গড়েছেন। এটি নিজেই একটি অপরাধ উপন্যাসের বিষয়।
রাজস্থানের অ্যান্টি-গ্যাংস্টার টাস্ক ফোর্সের প্রধান এম এন দীনেশ রাজ্যে গ্যাংগুলোর গতিবিধির ছক তৈরি করছেন। তিনি বলেন, ‘সালমান খান তাদের প্রচারের বাহন। এভাবে তারা শিরোনামে আসে। আসল লক্ষ্য চাঁদাবাজি। চমকপ্রদ গুলির ঘটনা ঘটিয়ে তারা বড় ক্ষমতাধর ও বড় আলোচনার চাঁদাবাজির জগতে ঢোকে। সাধারণত তারা ভাড়াটে শুটার নেয়। কিছু ক্ষেত্রে শুটার দক্ষ না হলে তারা তাকে ফেলে দেয়, পুলিশ ধরুক। কিন্তু দলের সদস্য বা সম্ভাবনাময় কোনো শার্পশুটার থাকলে তার পালানোর পথও তারা ঠিক করে রাখে। রাজস্থানের অ্যান্টি-গ্যাংস্টার টাস্ক ফোর্স এমন অনেক ভাড়াটে খুনিকে গ্রেপ্তার করেছে। সম্প্রতি রাজস্থানে তাদের লক্ষ্য ছিল কংগ্রেসের এক সাবেক বিধায়ক। কিন্তু যোধপুরে শুটারদের ধরে ফেলায় তারা তার কাছে পৌঁছাতে পারেনি।’
লরেন্সের ১৯৯৮ সালের শিকারের মামলা টেনে আনা নিয়ে যোধপুরে নানা প্রতিক্রিয়া আছে।
বিষ্ণোই টাইগার ফোর্সের সদস্য ও সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক রাম নিবাস বিষ্ণোই বলেন, ‘সালমান খানের শিকারের মামলা বিষ্ণোইদের কাছে আবেগের বিষয়। আমরা এখনো এই মামলায় ন্যায়বিচার দেখিনি। চিঙ্কারা শিকারের মামলায় হাইকোর্ট অভিনেতাকে খালাস দিয়েছে। কৃষ্ণসারের মামলায় আপিল বিচারাধীন। সুপ্রিম কোর্টে বিশেষ অনুমতি আবেদনও রাজ্য সরকার জোরালোভাবে উপস্থাপন করেনি। তাই বাস্তবে এই মামলায় ন্যায়বিচার প্রায় নেই। লরেন্স বিষ্ণোইয়ের কাছে সালমান একজন তারকা। কিন্তু আমরা সালমানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা চাই, তার মৃত্যু চাই না। বিষ্ণোই সম্প্রদায় গাছ, প্রাণী ও পাখি রক্ষা করে। আমরা অহিংসার সম্প্রদায়। তাহলে আমরা কীভাবে সহিংসতার ডাক দেব বা সমর্থন করব?’
রাম নিবাস সালমান খানের বিরুদ্ধে অনেক বিক্ষোভ নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে যোধপুরে সালমানের আদালতে হাজিরার সময় তিনি এসব করেছেন।
মামলাটি এখন বিচারিক আদালতে আছে। বদলির আবেদনের মাধ্যমে এটি হাইকোর্টেও গেছে। তাই শুনানিতে সালমান খানকে ব্যক্তিগতভাবে আদালতে হাজির হতে হয় না। এতে মামলা ঘিরে উত্তেজনা কিছুটা কমেছে।
যোধপুর জেলা বিষ্ণোই মহাসভার সভাপতি নারায়ণ রাম বিষ্ণোই বলেন, ‘এসব বক্তব্য গণমাধ্যমের তৈরি। লরেন্স বিষ্ণোই কী বলেছে বা দাবি করেছে, আমরা তা যাচাই করতে পারি না। আমরা কেবল গণমাধ্যমে এ খবর দেখি। তবে সম্প্রদায় হিসেবে আমরা কোনো অপরাধমূলক বা অসাংবিধানিক কাজ সমর্থন করতে পারি না।’
সম্প্রদায়ের কেউ কেউ এ বিষয়ে এড়িয়ে যান। কিন্তু অখিল ভারতীয় বিষ্ণোই মহাসভার দেবেন্দ্র বুধিয়া অনেক স্পষ্ট। তিনি বলেন, সালমান খান বিকানেরের মুক্তি ধামে না গেলে এই বিরোধ শেষ হবে না। সেখানে সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা গুরু জম্ভেশ্বরের সমাধি আছে। সালমানকে সেখানে গিয়ে হরিণ মারার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। বুধিয়ার কথায় গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের কথার প্রতিধ্বনি মেলে।
মতামত ভিন্ন হলেও একটি বিষয় পরিষ্কার। টাইগার শ্রফের ঘটনায় সালমান খানের যোগসূত্র ১৯৯৮ সালের কৃষ্ণসার শিকারের মামলাকে আবার আলোচনায় এনেছে। লরেন্স বিষ্ণোইয়ের গ্যাং আবারও একটি অপরাধকে সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের আড়ালে ঢেকে ব্যবহার করছে।