মোঃ আল শাহারিয়া সুইট
প্রকাশ: ২৩:৪৮, ২৬ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২৩:৪৯, ২৬ আগস্ট ২০২৬
মুহাম্মাদ (সাঃ) শুধু ইসলামের নবী নন, তিনি মানবতার রূপকার
পৃথিবীর জনপদগুলো যখন ক্লান্তিকাল পার করছিল, তখনই আরবের মরুতে দীপ্তিময় আলো জ্বলে উঠল। আরবের মাজলুমদের মুখে হাসি ফুটিয়ে, কিসরার প্রাসাদের ১৪টি স্তম্ভে কম্পন ধরিয়ে, এক হাজার বছর ধরে প্রজ্বলিত পারস্যের অগ্নিশিখা নিভিয়ে এই ধরাকে আলোকিত করে, মা আমেনার পবিত্র গর্ভে আরবের সুনামধন্য কুরাইশ বংশে ৯ অথবা ১২ রবিউল আউয়াল, ২০ অথবা ২২ এপ্রিল ৫৭১ ঈসায়ী সালে জন্মগ্রহণ করেন হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মগ্রহণের সময় আসহাবে ফিলের (হস্তীবাহিনীর) ঘটনা ঘটেছিল। পারস্যের সাওয়া উপসাগর আচমকা শুকিয়ে যায়। পারস্যের যে অগ্নিশিখা এক হাজার বছর ধরে প্রজ্বলিত ছিল এবং এক মিনিটের জন্যও নিভেনি, সেটিও নিভে গিয়েছিল। জালিম শাসক কিসরার প্রাসাদের ১৪টি স্তম্ভ কেঁপে উঠেছিল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন এক মহামানব, যাঁকে নিয়ে লেখার মতো যোগ্যতা আমার হয়নি। তিনি এসেছিলেন বলেই আরবের জাহেলি সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। তাঁর আগমনের পরই কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নির্মম প্রথা বন্ধ হয়। তিনি শুধু মুসলিম ও ইসলামের কল্যাণের জন্য আগমন করেননি; তিনি এসেছিলেন পুরো জমিনের কল্যাণের জন্য।
মহান আল্লাহ তাঁকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন রাহমাতুল লিল আলামিন রূপে—অর্থাৎ তিনি সমগ্র জগতের জন্য রহমত। তাঁর বিনয় ও লজ্জা ছিল শৈশব থেকেই। ছোট্ট অবস্থায় একবার তাঁর সতর খুলে গিয়েছিল; তা দেখে তিনি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন মানবতার প্রেমে এক মহামনীষী। তাই ফিজারের যুদ্ধের অশান্তি থেকে মানুষকে রেহাই দিতে গড়ে তুলেছিলেন হিলফুল ফুযুল—একটি শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগঠন।
তিনি তাঁর মহানুভবতা দিয়ে মানুষের মন জয় করেছিলেন। অমুসলিমদের প্রতিও তিনি ইনসাফ করেছিলেন। তাই তো ঘোর শত্রুও একসময় ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আবু সুফিয়ান ও উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বিশ্বস্ততায় এতটাই অনন্য ছিলেন যে, তাঁর শত্রুরাও তাঁকে আমানতদার মনে করত। তাঁর বিশ্বস্ততা ও চরিত্র খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার মন জয় করেছিল। এমনকি মৃত্যুমুখেও তিনি মানুষের আমানত তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে সচেতন ছিলেন।
তিনি ছিলেন ক্ষমাশীল। যে মাতৃভূমি থেকে তাঁকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল, সেই মাতৃভূমি জয় করেও তিনি শত্রুদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেননি; পক্ষান্তরে ঘোষণা করেছিলেন সাধারণ ক্ষমা।
তিনি ছিলেন বিনয় ও নিষ্ঠার রূপকার। তাঁর কর্ম ছিল শ্রেষ্ঠত্বের অনন্য উদাহরণ। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব এতটাই মহিমান্বিত যে, একজন কবি তাঁর কবিতায় তাঁকে আবৃত্তি করে আবেগে ভেসে যেতে পারেন, একজন গায়ক তাঁর সুরে তাঁকে নিয়ে গাইতে গিয়ে মাধুর্য এনে দিতে পারেন, আর একজন লেখক তাঁর বইয়ে লিখতে গিয়ে আবেগ ও ভালোবাসায় আপ্লুত হতে পারেন।
তিনি ছিলেন ইসলামের নবী; কিন্তু তাঁকে নিয়ে লিখেছেন গুরুদত্ত সিং ও স্বামী লক্ষ্মণ-এর মতো মানুষও। আর মাইকেল হার্টের র্যাংকিংয়ে তো তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষী হিসেবে স্থান পেয়েছেন।
তিনি শুধু ইসলামের নবী নন তিনি মানবতার রূপকার।
আশরাফুল ইসলাম
সিএসই ডিপার্টমেন্ট
মরুর দিগন্তে আলোর ফোয়ারা: নবীজির (স.) ধরণীতে আগমন ও রূপান্তর
প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারের গভীর চাদর ভেদ করে যখন মরুর দিগন্তে এক আলোর ফোয়ারা হয়ে এলেন প্রিয়নবী (স.), তখন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল যুগান্তরের ঘুনে ধরা মানবতা। অসভ্যতার করাল গ্রাসে পিষ্ট সেই আরব জমিনে তিনি কেবল একজন বার্তার বাহক হয়ে আসেননি, এসেছিলেন এক মহা-দর্শনের রূপকার হিসেবে। তাঁর সেই ধরণীতে পদার্পণ যেন ধূলিমলিন পৃথিবীর বুকে এক স্বর্গের পরশ, যা মানুষের আত্মায় জাগিয়েছিল মুক্তির এক চিরন্তন স্পন্দন। সে আগমনবার্তা শোনার অপেক্ষায় যেন পিয়াসী হয়ে ছিল গোটা সৃষ্টি; মরুভূমির শুষ্ক বালুকাবেলা থেকে শুরু করে আকাশ-বাতাস, চন্দ্র-সূর্য আর ধরণীর প্রতিটি ধূলিকণা যেন এক অব্যক্ত আনন্দে গেয়ে উঠেছিল বসন্তের জয়গান। প্রকৃতিও সেদিন তার মলিনতা ঝেড়ে ফেলে বরণ করে নিয়েছিল সেই মহামানবকে, যেন বিশ্বপ্রকৃতি তার সুপ্ত বসন্তের সাজে সেজে সায়াহ্নের ক্লান্তি ভুলে নতুন এক প্রাণের ছান্দসিক স্রোতে ভেসে গিয়েছিল।
সেদিন এক স্নিগ্ধ আলোয় ধুয়ে গিয়েছিল সামাজিক সম্পর্কের নিষ্ঠুর টানাপোড়েন ও গোত্রীয় অন্ধ অহংকার। যে সমাজে কন্যাসন্তান ছিল অপমানের বোঝা, সেখানে তিনি তাদের মাথায় পরালেন মর্যাদার মুকুট; ধনী-দরিদ্রের কৃত্রিম দেয়াল ভেঙে মানুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দিলেন মানবতার অভিন্ন সুষমা। এক অদ্ভুত জাদুকরী ছোঁয়ায় তিনি পাষাণ হৃদয়গুলোকে বানিয়ে তুললেন ভালোবাসার প্রস্রবণ, যেখানে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের সুর বেজে উঠেছিল প্রতিটি প্রহর জুড়ে, যেন এক দীর্ঘ মরুভূমির বুক চিরে বয়ে চলা সুপেয় ঝরনাধারা।
রাজনীতির রুক্ষ ও কর্কশ প্রান্তরকেও তিনি রূপ দিয়েছিলেন ন্যায়বিচার আর শাশ্বত শান্তির এক সুশীতল ছায়ায়। রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব আর গোত্রীয় আধিপত্যের বিষবাষ্পে যখন চারপাশ নীল, তখন মদিনার স্নিগ্ধ প্রান্তরে তিনি গেঁথেছিলেন সম্প্রীতির অমর কাব্য—'মদিনা সনদ'। ক্ষমতার লোলুপ দৃষ্টিকে পেছনে ফেলে তিনি শিখিয়েছিলেন কেমন করে প্রজার চোখের জল মুছতে হয়, কেমন করে ভিন্নমত আর ভিন্ন পথের মানুষকেও হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান দিয়ে এক অখণ্ড ঐক্যের বন্ধনে বাঁধা যায়।
আর বুদ্ধিবৃত্তির আকাশে তো তিনি জ্বালিয়েছিলেন এক চিরন্তন প্রদীপ, যা মুছে দিয়েছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা কুসংস্কারের জঞ্জাল। ঐশী বাণী "ইখরা" অর্থাৎ "পড়ো"—এই অবিনশ্বর আদেশের মধ্য দিয়ে তিনি ঘোষণা করলেন যে, জ্ঞানার্জন কেবল শৌখিনতা নয়, বরং প্রতিটি মানবসত্তার ওপর স্রষ্টার এক অবধারিত বিধান ও ফরজ দায়িত্ব। মানুষ তখন ভিত্তিহীন কুসংস্কার আর অন্ধ বিশ্বাসের গ্লানি থেকে মুক্তি পেয়ে যুক্তিবাদী ও সত্যসন্ধানী হয়ে ওঠে। তাঁর দেখানো সেই জ্ঞানালোকের পথ ধরেই পরবর্তীতে পৃথিবীর বুকে প্রস্ফুটিত হয়েছিল বিজ্ঞান, দর্শন ও সভ্যতার এক অমিয় বসন্ত।
পরিশেষে তাঁর সেই আগমন ছিল মানবাত্মার এক অপূর্ব পুনর্জন্ম। মদ্যপান, হিংসা আর অন্যায়ের গভীর খাদ থেকে টেনে তুলে তিনি মানুষের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনকে এক পূতপবিত্র ফুলের মতো সুবাসিত করে তুলেছিলেন। দুনিয়ার মোহ আর পরকালের চিরন্তন জবাবদিহিতার এক অপূর্ব সেতুবন্ধন রচনা করে তিনি মানুষকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে মাটির মানুষ হয়েও আসমানী মর্যাদায় উন্নীত হতে হয়।
মোঃ সৌমিক হাসান
সিএসই ডিপার্টমেন্ট
মহানবী (সা.)-এর আগমনে মানবজাতির কল্যাণ
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান রহমত। তাঁর মাধ্যমে মানুষ তাওহিদ, ঈমান, ইবাদত ও সঠিক জীবনব্যবস্থার শিক্ষা লাভ করেছে। আল্লাহ বলেন, “আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।” সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭।
তাঁর আগমনের আগে আরব সমাজে অজ্ঞতা, শিরক, অন্যায়, সুদ, মদ্যপান ও নারীর প্রতি অবিচার ব্যাপক ছিল। তিনি মানুষকে এসব থেকে মুক্ত করে ন্যায়, মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের পারস্পরিক অধিকার, পরিবার, প্রতিবেশী, এতিম, দরিদ্র ও নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
তিনি বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।” -তিরমিজি।
আরও বলেছেন, “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তার ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করে।” -সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম। ফলে মানুষের জীবন শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, সামাজিক ও নৈতিক দিক থেকেও সুন্দর হয়েছে।
আজ আমরা যে ঈমান, নামাজ, রোজা, যাকাত, হজ, কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা অনুসরণ করি এসবই রাসুল (সা.)-এর মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছেছে। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করলে জীবনে শৃঙ্খলা, সততা, দয়া, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। তাই তাঁর আগমন শুধু মুসলিম উম্মাহর জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্যই এক অসীম কল্যাণ ও রহমত।
মোবাশ্বির রাকিব
সিএসই ডিপার্টমেন্ট
মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো শুধু একটি সময়কে নয়, পুরো পৃথিবীর গতিপথকে বদলে দিয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন তেমনই একটি ঘটনা। তাঁর আগমনের পূর্বে আরব সমাজে অজ্ঞতা, মূর্তিপূজা, গোত্রীয় সংঘাত, অন্যায়-অবিচার ও নানা ধরনের সামাজিক বৈষম্য ছিল। মানুষ অনেক সময় শক্তি ও বংশের অহংকারকে মর্যাদার মাপকাঠি মনে করত। দুর্বল, এতিম ও অসহায় মানুষের অধিকারও যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। এমন এক পরিস্থিতিতে নবী করিম (সা.) মানুষকে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, সত্য ও ন্যায়ের পথে চলা এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেন। তাঁর দাওয়াত মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও জীবনযাপনে মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করে।
নবী করিম (সা.)-এর শিক্ষা শুধু ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ব্যক্তিগত চরিত্র থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ে। তিনি সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ক্ষমা, দয়া, প্রতিবেশীর অধিকার, এতিমের প্রতি দায়িত্ব এবং অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছেন। একই সঙ্গে নারী, শিশু, দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মানুষের মধ্যে বংশ, গোত্র বা সম্পদের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার পরিবর্তে তাকওয়া ও নৈতিক চরিত্রকে মর্যাদার মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর আদর্শে গড়ে ওঠা সমাজে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও দায়িত্ববোধের চর্চা বৃদ্ধি পায়, যা পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একটি নতুন সভ্যতার বিকাশে ভূমিকা রাখে।
আমার দৃষ্টিতে, নবী করিম (সা.)-এর আগমনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল মানুষের চিন্তা ও চরিত্রের পরিবর্তন। তিনি মানুষকে শুধু ভালো কথা বলেননি, বরং নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে ন্যায়, দয়া, সততা ও ক্ষমার মাধ্যমে একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা যায়। তাই তাঁর আগমনকে শুধু ইসলামের ইতিহাসের একটি ঘটনা হিসেবে দেখলে এর ব্যাপকতা পুরোপুরি বোঝা যায় না; বরং এটি মানবতার জন্য একটি নতুন আদর্শের সূচনা। আজকের পৃথিবীতে যখন হিংসা, বৈষম্য ও অন্যায় বিভিন্নভাবে দেখা যায়, তখন মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা অনুসরণ করে ন্যায়, মানবিকতা ও শান্তির সমাজ গড়ে তোলার প্রয়োজন আরও বেশি।
জোনায়েদ হোসেন রাতুল
সিএসই ডিপার্টমেন্ট
আসসালামু আলাইকুম। সালাম ও সালাওয়াত বর্ষিত হোক রাসুল সা: এর ওপর।
যুগে যুগে পথ ভ্রষ্ট মানুষকে পথের সন্ধান যোগাতে আল্লাহ সুবহানা তায়ালা যুগে যুগে নবী রাসূল পাঠিয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় সমস্ত মিথ্যা ইলাহ,ত্বাগুত,কুফর সহ যাবতীয় জাহলিয়াতকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে আল্লাহ তায়ালার তাওহীদকে মুখে, অন্তরে,কাজে ধারণ করে, এই উম্মাকে তাওহীদ এর পথের পথিক হিসেবে গড়ে তোলার মহান কর্মযোগ্য নিয়ে আসেন রাসুল সা:। নবজাতক অবস্থায়,শৈশবকাল,কৈশোর থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগে শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত তিনি রেখেছেন ইনসাফের অখন্ডিত সব দৃষ্টান্ত। দেখিয়েছেন মানবজাতির ইতিহাসের সব থেকে নিখুত ও শত ভাগ নিশ্চিত জীবন ব্যবস্থাকে ব্যক্তি, রাষ্ট্র, সমাজে প্রয়োগের পথ ও সুফল।
রাসুল ছিলেন একজন যোগ্য নেতা,যোগ্য স্বামী, যোগ্য পিতা। একজন যোগ্য নেতা হিসেবে যা গুণ থাকা প্রয়োজন তার সবকিছু রাসুলের মধ্যে ছিল। তিনি তার সাথীদেরকে সব অবস্থায় আগলে রেখেছেন, শিখিয়েছেন তাওহীদের শিক্ষা, শিখিয়েছেন কিভাবে একজন প্রকৃত মুমিন হওয়া যায়,শিখিয়েছেন মানবজাতির মুক্তির পথের যাবতীয় সূত্র ও তার সমাধান। তিনি মুসলিমদের ক্ষেত্রে ছিলেন নরম এবং কুফারদের বিরুদ্ধে ছিলেন কঠোর। ইসলামের প্রতিটি যুদ্ধে তিনি ছিলেন এক দুঃসাহসিক ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী নেতা। বিনা রক্তপাতে ১০ হাজার সাহাবী নিয়ে তিনি মক্কা বিজয় করেন। মক্কা বিজয়ের পর তিনি সাধারণ ক্ষমার যে দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা আমাদের সকলেরই জানা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি কিনা চৌদ্দশ বছর পূর্বে বসবাস করেও এই উম্মাহের মানুষগুলোকে মিস করতেন, তাদের সাথে সাক্ষাৎ করার আকাঙ্ক্ষা রাখতেন। একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবীদের কে নিয়ে বসে ছিলেন এবং তিনি বলছিলেন,"আমি আমার ভাইদের কে খুব মিস করছি। "তখন তার সাহাবিরা তাকে প্রশ্ন করেন, "ইয়া রাসুল আল্লাহ আমারা কি আপনার ভাই নই?" তখন তিনি বলেন," না তোমরা আমার ভাই নও, তোমরা হলে আমার সাহাবী।আমার ভাই তো হচ্ছে তারা যারা আমাকে না দেখেই আমার উপর ঈমান এনেছে, আমাকে বিশ্বাস করেছে।" আহা কি অসাধারণ ছিলেন রাসুল তাইনা?মৃত্যুর পূর্বক্ষণেও তার মুখে শুধু একটাই কথা ছিল ইয়া উম্মাতি, ইয়া উম্মাতি।
রাসুলকে নিয়ে লেখার শেষ নেই, পৃথিবীতে হয়তো শব্দ ভান্ডার শেষ হবে তবে রাসুলকে নিয়ে লেখা শেষ হবে না। পৃথিবীর সমস্ত কবি হয়তো একদিন লেখা শেষে ঘুমাবেন,হয়তো ফুরোবে কলমের কালি,হয়তো অচল হয়ে যাবে হাতটাও তবুও ফুরোবে না রাসুলের গুনগান। আপনাকে ভালোবাসি ইয়া রাসুল আল্লাহ। আমরা জানি আমরা আপনার হক আদায় করতে পারি না,আপনার সুন্নাহকে আকড়ে ধরতে পারি না। তবুও একজন ইয়াতিম উম্মত হিসেবে আপনার শাফায়াত এর অপেক্ষা করি ইয়া রাসুল আল্লাহ।
ইয়া আল্লাহ, আজ এই উম্মাহ ইয়াতিম আপনার রাসুল নেই, বড় অসহায় এই উম্মাহ। আপনার রাসুলের ওয়াছিলায় হলেও এই উম্মাকে আপনি মাফ করুন, রহম করুন। সর্বোপরি ইত্তাবায়ে রাসুল অনুসরণের তাওফিক এনায়েত করুন আমিন, ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালাগ।
নাফিজ ছাদিক জিহাদ
সিভিল ডিপার্টমেন্ট
আপনাকে ভালোবাসি হে রাসুল, জীবনের চেয়েও বেশি
রাসুলুল্লাহ সাঃ তো তিনি
যার নাম ছাড়া আমাদের কালিমা পূর্ণ হয়না, যার নাম ছাড়া আযান পূর্ণ হয়না, নামাজ পূর্ণতা পায়না।
সকল সৃষ্টির মধ্যেই তিনিই শ্রেষ্ঠ।
সকল নবী ও রাসুলদের সর্দার তিনি।
সকল নবী-রাসুলগণ যখন পেরেশানিতে থাকবেন তখনও আমাদের নবী উম্মতের চিন্তায় অস্থির থাকবেন।
তিনি ছিলেন সকল সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত। ছিলেন অত্যন্ত কল্যাণকামী ও পরম স্নেহশীল। আর এই নাম আল্লাহ নিজের জন্য রেখেছেন সেই একই নামে তিনি রাসুলকে ডেকেছেন। ( রঊফুর রহীম)
তার ব্যাপারে আমাদের কবরে প্রশ্ন করা হবে তার সুপারিশ ছাড়া কেউ জান্নাতে যেতে পারবেনা। তিনিই প্রথম জান্নাতে পা রাখবেন৷
স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তার উপর সালাত ও সালাম প্রেরণ করেন।
জিবরাইল আ. ফেরেশতা ও সকল সৃষ্টি তার উপর সালাত, সালাম ও দরুদ প্রেরণ করে।
ইয়া রাসুলুল্লাহ, আপনার চলার পথে মেঘ ছায়া দিয়েছে, আপনার সাক্ষাতে উঠ সিজদাহ্ দিয়েছে আর আপনার একটি ইশারায়, চাঁদ ও মাথানত করে দুই টুকরো হয়ে গেয়েছিলো।
সৃষ্টি জগতে আপনার কোন তূলনা নেই, আপনার দরবারে খাদেম হয়েছেন ফেরেশতা দের সর্দার জিবরাইল (আ:)
গোটা দুনিয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালা আপনাকে রহমত হিসাবে পাঠিয়েছেন।
দুনিয়াতে থাকতেই মহান রব আপনাকে তার দিদারে কাছে ডেকে নিয়েছেন, আপনি আরশে পৌঁছে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। প্রতি আসমানে মহান নবীগণ ছিলেন আপনার সংবর্ধনায়। সকল নবীগণ পবিত্র আকসায় আপনার ইমামতি তে সালাত আদায় করেছেন।
আল্লাহর পরে সর্বোচ্চ মর্যাদা আপনার মোস্তফা সাঃ।
হে আল্লাহর প্রিয় হে নবীদের শেষজন সাঃ
আপনার মাধ্যমে উজ্জ্বল হয়েছে মানবতার কপাল।
আপনি উম্মতের নেতা এবং প্রবর্তক অন্ধকারের সমুদ্রে আপনি আশ্রয়।
আল্লাহ আপনার সৌন্দর্যের উপরে সীমাহীন বরকত দিয়েছেন
সমস্ত নবীদের সব মুযিজা আপনার মধ্যে আবির্ভূত হয়েছে।
আপনার চেয়ে সুন্দর কোনো পুরুষ জন্ম দেয়নি কোনো নারী।
সকল অসুন্দর ও অসংলগ্নতা থেকে পবিত্র করে আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
আপনি পৌঁছেছেন এক রাতে সর্বোচ্চ আরশে।
আপনার মর্যাদা বুদ্ধির সীমার উপরে মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বিশ্বজগত যখন ঘুমে বিভোর তখন তাদের জন্যই আপনি চিন্তায় বিভোর হয়ে কেঁদে বুক ভাসাতেন
কত অসহনীয় ব্যাথা আর যন্ত্রনা সয়ে গেছেন অকাতরে, তায়েফের রক্তে আপনি আপনার জুতা পিচ্ছিল হয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন, ওহুদে আঘাতে আপনি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন, আপনার দাত মোবারক শহীদ হয়েছিলো, আর বর্ম ভেঙে আপনার চোয়ালের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিলো। শিয়াবে আবু তালেবে আপনার খাদ্যপানীয় ছাড়া নির্ঘুমে কাটানো সময় গুলো এখনো আমাকে ডুকরে কাঁদায়।
ইয়া রাসুলুল্লাহ, ২৩ বছর জীবনের মধ্যে মক্কায় ১৩ বছর তো মানুষ গঠনে আপনি স্থির হতে পারেন নি এরপর মদিনার অধিকাংশ সময় কেটেছে যুদ্ধ, সন্ধি আর ভিনদেশের কুটনৈতিক কার্যক্রমের ব্যস্ততায়। আর এই সবকিছুর মধ্যে আপনার ব্যস্ততা আর সফলতা নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমার মাথায় আসে সেই কাঁচা ঘরের বারান্দার দৃশ্য। মসজিদে নববীর বারান্দা। মাটির দেয়ালের উপর খেজুর পাতার চালা। সেখানে বসে আছেন আবু বকর (রদ্বিয়াল্লাহু আনহু)। আপনার পর উম্মতের শ্রেষ্ঠতম মানুষ তিনি। যিনি মুসলিমদের মধ্যে আপনার শূন্যতার সময়ে আপনার খলিফা হিসেবে নির্বাচিত হন। মাত্র দুই বছরের মধ্যে আপনার রেখে যাওয়া উম্মতের অভ্যন্তরীণ সকল ফিতনা, রিদ্দা, বিদ্রোহ ও বিভক্তি দমন করে এই উম্মতকে রোম ও পারস্যের দিকে যাত্রা করান। এই বারান্দায় আছেন উমার ইবনুল খাত্তাব (রদ্বিয়াল্লাহু আনহু)। অর্ধ জগতের অধিপতি। পাতার পাটিতে বসে হাজার হাজার বছরের পুরনো রোম ও পারস্যকে পদানত করার সাথে সমগ্র দুনিয়ায় ন্যায়বিচারের উপমা হয়ে ওঠা সম্রাট তিনি। এখানেই বসে আছেন উসমান ইবনু আফফান, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ ও আমর ইবনুল আস (রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)। ইসলামী অর্থনীতির যে কল্যাণ মানবজাতির উপর বর্ষিত হয়, তার উজ্জ্বল উপমা প্রদর্শন করেছেন তাঁরা। বিনয় আর দুনিয়াবিমুখতায় প্রাচুর্যকে বিনির্মাণ করা মহামানব তাঁরা। খোরাসান থেকে ককেশাস পর্যন্ত ইসলামের পতাকা যাঁর আদেশে পৌঁছে গেছে, সেই উসমান (রদ্বিয়াল্লাহু আনহু)। এখানেই আছেন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ প্রমুখ সাহাবী (রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সেনাপতিদের মিলনমেলা। যাঁদের সামনে সুপ্রাচীন সভ্যতা আর রাজত্বের ভীতগুলো আছড়ে পড়েছে একের পর এক, এখানেই আছেন ইবনুল আব্বাস, ইবনু উমার, আনাস ইবনু মালেক, আবু হুরাইরার মতো সাহাবা (রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)। তাঁদের ইলমের স্তম্ভে গড়েন উঠেছে ইসলামী জ্ঞানের ইমারত, তাঁদের ইলম আলোকিত করেছে পরবর্তী ইসলামী সোনালি সভ্যতাকে। এমন ব্যক্তিবর্গ এখানে আছেন, যাঁরা দুনিয়ায় থাকা অবস্থায় পরকালে জান্নাতের সুসংবাদ লাভের মতো মহান। এই বারান্দায় ছড়িয়ে আছেন সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে ধ্বংস পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নৈতিকতা, বিশ্বাসের শুদ্ধতা, ব্যক্তিত্ব ও আখলাকের মহত্ত্বে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম;
মোঃ সাইফ হোসেন
সিএসই ডিপার্টমেন্ট