বেগম খালেদা জিয়া: সংগ্রামেই কেটেছে জীবন, সংগ্রামেই বিদায়

প্রকাশ: ১৩:৪৯, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১৭:০১, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

বেগম খালেদা জিয়া: সংগ্রামেই কেটেছে জীবন, সংগ্রামেই বিদায়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য নাম—বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের অগ্রভাগের যোদ্ধা এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার জীবন ছিল সংগ্রাম, সাহস ও দৃঢ়তার এক দীর্ঘ অধ্যায়।

মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫। বিজয়ের মাসের এক ভোরে, সকাল ৬টায়, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

বেগম খালেদা জিয়ার প্রকৃত নাম খালেদা খানম, ডাকনাম পুতুল। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৫ আগস্ট ১৯৪৬ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তার পিতা ইস্কান্দর মজুমদার একজন ব্যবসায়ী এবং মাতা বেগম তৈয়বা মজুমদার ছিলেন গৃহিণী।

পারিবারিকভাবে তার আদি পিতৃভিটা ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে হলেও স্থায়ীভাবে দিনাজপুরের মুদিপাড়ার সঙ্গে তার শৈশব ও কৈশোর জড়িয়ে আছে।

শিক্ষা ও দাম্পত্য জীবন

পাঁচ বছর বয়সে দিনাজপুর মিশন স্কুলে তার শিক্ষা জীবন শুরু হয়। পরে দিনাজপুর গার্লস স্কুল এবং সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন।

১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে তার বিয়ে হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সামরিক নেতা, স্বাধীনতার ঘোষক এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় খালেদা জিয়াকে দুই পুত্রসহ পাকিস্তানি সেনারা গ্রেপ্তার করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আটক রাখে। ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার পর তিনি মুক্তি পান। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে তিনি দীর্ঘদিন ছিলেন নিভৃতচারী এক গৃহবধূ।

রাজনীতিতে আগমন

১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর রাজনৈতিক শূন্যতা ও অস্থিরতার মধ্যে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার

সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে সাতদলীয় ঐক্যজোট গঠন করে তিনি আপসহীন আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। দীর্ঘ আট বছরের ধারাবাহিক সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব

বেগম খালেদা জিয়া তিন দফায় মোট ১০ বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন—

  • ১৯৯১–১৯৯৬

  • ১৯৯৬ (নির্বাচনের পর এক মাসের জন্য)

  • ২০০১–২০০৬

তার নেতৃত্বেই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান।

পরবর্তী রাজনৈতিক অধ্যায়

২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর বিএনপি বিরোধী রাজনীতিতে অবস্থান নেয়। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি সংসদের বাইরে চলে যান। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার, কারাবাস ও গৃহবন্দি অবস্থার মধ্য দিয়ে তার জীবন কঠিন অধ্যায়ে প্রবেশ করে।

কারাবাস ও চিকিৎসা সংগ্রাম

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যান খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে গুরুতর অসুস্থতার কারণে সরকারের নির্বাহী আদেশে বাসায় থেকে চিকিৎসার সুযোগ পান। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালসহ দেশ-বিদেশে চিকিৎসা নেন। ২০২৫ সালের শুরুতে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডন যান এবং চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরেন।

পরিবার

তার বড় ছেলে তারেক রহমান বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালে মালয়েশিয়ায় ইন্তেকাল করেন।

শেষ অধ্যায়

দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোরে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে।

ইতিহাসে অবস্থান

বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি দলের নেত্রী ছিলেন না—তিনি ছিলেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতীক, আপসহীন রাজনীতির এক সাহসী মুখ। তার জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন