প্রকাশ: ১৩:২৩, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও দেশত্যাগের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই নির্বাচন, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত। দীর্ঘ দেড় দশকের একচেটিয়া রাজনৈতিক প্রভাবের পর এবারের ভোটকে অনেকেই ২০০৯ সালের পর প্রথম প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে দেখছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাংগঠনিক পুনর্গঠন, তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং কৌশলগতভাবে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার কারণে জামায়াতের ভোটব্যাংক আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। কয়েকটি নগর ও উপকূলীয় এলাকায় দলটির সমর্থন দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে বলে স্থানীয় পর্যবেক্ষণেও দেখা যাচ্ছে। জনমত জরিপে ধারণা করা হচ্ছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা দলটি এবার তাদের ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফল পেতে পারে, যদিও এককভাবে সরকার গঠন করার সম্ভাবনা সীমিত বলেই মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, বিরোধী জোটের প্রধান শক্তি হিসেবে বিএনপিকেই অধিকাংশ এলাকায় জোটের সামগ্রিক ফল নিশ্চিত করতে মূল দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। জোটের অন্যান্য দলের তুলনামূলক সীমিত সাংগঠনিক সক্ষমতার কারণে প্রচারণা, সমন্বয় এবং ভোট ব্যবস্থাপনার বড় অংশ বিএনপিকেই সামলাতে হচ্ছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। বিএনপি নেতারা দাবি করছেন, কৌশলগত সমঝোতা এবং জোটগত সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্বাচনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বড় ভূমিকা রাখছে জেনারেশন জেড ভোটাররা। বিশ্লেষকদের মতে, মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই প্রজন্মের হওয়ায় ফল নির্ধারণে তাদের ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের নয়, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
সারা দেশে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ এবং জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকসংবলিত পোস্টার, ব্যানার ও প্রচারণা সামগ্রী নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে। বিভিন্ন এলাকায় দলীয় অস্থায়ী কার্যালয়, সভা-সমাবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা নির্বাচনী উত্তাপ বাড়িয়ে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনের ফলাফল আঞ্চলিক কূটনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। শেখ হাসিনার সময় ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এখন বাংলাদেশে চীন ও ভারতের প্রভাব নতুনভাবে নির্ধারিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিএনপি জানিয়েছে, তারা সরকার গঠন করলে বাংলাদেশের স্বার্থে যেসব দেশ সহযোগিতা করতে আগ্রহী থাকবে, তাদের সঙ্গেই ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ সময়েই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ দুর্নীতি ও মূল্যস্ফীতি—যা নির্বাচনী আচরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, একদিকে বিএনপি জোটগত বিজয় নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক দায়িত্ব বহন করছে, অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট তাদের ইতিহাসের সেরা ফলাফলের দিকে এগোচ্ছে। ফলে দীর্ঘ সময় পর অনুষ্ঠিত এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।