শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১:৪৬, ১১ আগস্ট ২০২৬
বাংলার ছয় ঋতুর মধ্যে বর্ষার সঙ্গে কদম ফুলের সম্পর্ক যেন অবিচ্ছেদ্য। আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টিতে কদম ফুটলেই প্রকৃতি পায় অন্যরকম সাজ। তাই কদমকে বলা হয় বর্ষার দূত। বাঙালির সাহিত্য, সংস্কৃতি ও আবেগেও কদম ফুলের রয়েছে বিশেষ স্থান। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল’ কবিতার মধ্য দিয়ে বর্ষা ও কদমের সেই চিরন্তন সম্পর্ক আরও গভীরভাবে ফুটে উঠেছে।
শিবচর উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে এখন ফুটে আছে কদম ফুল। বিশেষ করে শিবচর-পাঁচ্চর সড়কের দুই পাশে দেখা যাচ্ছে বেশ কিছু কদম গাছ। সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া অসংখ্য কদম ফুল পথচারীদের দৃষ্টি কেড়ে নিচ্ছে। বৃষ্টিভেজা পরিবেশে এসব ফুল যেন প্রকৃতির সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি জনপদেই কদম গাছের দেখা মিলত। বর্ষা এলেই গাছগুলো ফুলে ফুলে ভরে উঠত। তরুণ-তরুণীরা প্রিয়জনকে কদম ফুল উপহার দিতেন। মেয়েরা খোঁপায় গুঁজতেন কদম। শিশুরা ফুল নিয়ে খেলায় মেতে উঠত। ফলে কদম ফুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের অংশ ছিল না, মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও আবেগের সঙ্গেও মিশে ছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। ফলজ ও বাণিজ্যিক গাছ লাগানোর প্রবণতা বাড়ায় কমে গেছে কদম গাছের সংখ্যা। ফলে আগের মতো গ্রামবাংলার পথে-প্রান্তরে চোখে পড়ে না এই গাছ। বর্ষা এলেই যে কদম ফুলের উৎসব দেখা যেত, সেটিও অনেকটা হারিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী রুহুল আমিন বলেন, “কদম গাছ আমাদের প্রকৃতি ও সংস্কৃতির অংশ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তার পাশে, হাট-বাজার ও খোলা জায়গায় বেশি করে কদম গাছ লাগানো উচিত। এতে প্রকৃতির সৌন্দর্য যেমন বাড়বে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে।”
কলেজ শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলেন, “কদম ফুল দেখলেই বর্ষার কথা মনে পড়ে। ছোটবেলায় কদম ফুল দিয়ে খেলার এবং খোঁপায় পরার অনেক স্মৃতি আছে। এখন আগের মতো কদম গাছ দেখা যায় না। তাই এই গাছ সংরক্ষণ করা দরকার।”
উপজেলা উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, “মানুষ এখন কদমের চেয়ে মেহগনিসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও দামি গাছ লাগাতে বেশি আগ্রহী। এ কারণে কদম গাছের সংখ্যা কমছে। পরিবেশের ভারসাম্য ও প্রকৃতির সৌন্দর্য ধরে রাখতে কদমসহ দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানো প্রয়োজন।”
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ.এম ইবনে মিজান বলেন, “কদম ফুল বর্ষার সৌন্দর্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কালের বিবর্তনে কদম গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানো ও সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”
শিবচরের সবুজ প্রকৃতির বুকে ফুটে থাকা কদম ফুল তাই শুধু বর্ষার সৌন্দর্য নয়—এটি বাঙালির শৈশব, স্মৃতি, সংস্কৃতি ও প্রকৃতিপ্রেমেরও প্রতীক। বর্ষার সঙ্গে এই চিরচেনা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে কদম গাছ রক্ষার পাশাপাশি নতুন করে গাছ লাগানোর উদ্যোগও প্রয়োজন।