তাওহিদুজ্জামান রোমান, শেরপুর
প্রকাশ: ১১:০৯, ১২ আগস্ট ২০২৬
দিনের আলোয় যে ধানখেত সবুজের সৌন্দর্য ছড়ায়, রাত নামলেই সেই মাঠ হয়ে ওঠে দুশ্চিন্তার কারণ। কারণ, হাতির একটি পাল নেমে এলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে কৃষকের কয়েক মাসের শ্রম। কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরবাড়ি, কখনো ঘটে প্রাণহানিও।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ে মানুষ ও বন্যহাতির এই মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা দীর্ঘদিনের। বনভূমি ও হাতির স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া, মানুষের বসতি ও কৃষিজমি বাড়ার মতো নানা কারণে এই সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন।
আজ ১২ আগস্ট বিশ্ব হাতি দিবস। হাতির আবাসস্থল রক্ষা, বন্যহাতি সংরক্ষণ এবং মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়। শেরপুরে দিবসটির তাৎপর্য শুধু একটি বন্যপ্রাণী রক্ষার আহ্বানে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সীমান্তের মানুষের নিরাপত্তা, কৃষি ও জীবিকার প্রশ্নও।
১৬ বছরে প্রাণ গেছে ৪৬ মানুষের
শেরপুরে মানুষ ও বন্যহাতির সংঘাতের ভয়াবহতার একটি চিত্র পাওয়া যায় বন বিভাগের তথ্য থেকে। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত ১৬ বছরে জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় হাতি-মানুষের সংঘাতে ৪৬ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে মারা গেছে ৩৪টি বন্যহাতি।
একজন মানুষের মৃত্যু মানে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনে বড় আঘাত। আবার একটি হাতির মৃত্যু মানে হারিয়ে যাওয়া একটি বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে এ সংঘাতকে শুধু ‘হাতির উপদ্রব’ হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না।
ধান পাকেনি, তবু কেটে ফেলেছেন কৃষকেরা
চলতি বোরো মৌসুমেও সীমান্তবর্তী এলাকার কৃষকেরা হাতির আতঙ্কে আগেভাগে ধান কেটে ঘরে তুলেছেন। অনেক জমির ধান পুরোপুরি পাকতে আরও কয়েক দিন বাকি ছিল। কিন্তু পাহাড়ে হাতির উপস্থিতির খবর পেয়ে অপেক্ষা না করে ধান কাটতে হয়েছে তাদের।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় মোট ৮ হাজার ৮৫৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। এসব এলাকার কৃষকের কাছে ধান শুধু একটি ফসল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের খাবার, ঋণ পরিশোধ ও পরবর্তী মৌসুমের প্রস্তুতি। কিন্তু হাতির পাল মাঠে নামলে সেই হিসাব মুহূর্তেই বদলে যায়।
পাহাড়ের পথ সংকুচিত হলে সংঘাত বাড়ে
বন্যহাতি খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলাচল করে। শেরপুরের গারো পাহাড়ের হাতির চলাচলের সঙ্গে ভারতের মেঘালয় অঞ্চলেরও যোগসূত্র রয়েছে। সীমান্তের এপাশ-ওপাশ মিলিয়ে তাদের বিচরণক্ষেত্র বিস্তৃত।
কিন্তু বনভূমির পরিবর্তন, মানুষের বসতি ও কৃষিজমির বিস্তার এবং হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় তাদের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। ফলে খাবারের সন্ধানে হাতির পাল লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসছে। সেখানেই তৈরি হচ্ছে মানুষ ও হাতির মুখোমুখি অবস্থান।
২০২৩ সালে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বন বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, ১৯৯৫ সাল থেকে শেরপুরে ৩২টি হাতি মারা গেছে। একই প্রতিবেদনে গারো পাহাড়ে হাতির আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে।
ফসল রক্ষার ফাঁদে হাতির প্রাণ
হাতির হাত থেকে ফসল রক্ষায় সীমান্তের কিছু এলাকায় বৈদ্যুতিক ফাঁদ ব্যবহারের ঘটনাও ঘটছে। চলতি বছরের মে মাসে নালিতাবাড়ীর নাকুগাঁও এলাকায় ধানখেত ঘিরে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ বৈদ্যুতিক ফাঁদের ঘটনা সামনে আসে। এ ধরনের ফাঁদ হাতি ছাড়াও মানুষ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য বিপজ্জনক।
ফসল রক্ষার উদ্বেগকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রাণঘাতী ফাঁদ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বরং এতে মানুষ ও বন্যপ্রাণী—উভয়ের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
শুধু হাতি তাড়িয়ে সমাধান নয়
লোকালয়ে হাতি ঢুকে পড়লে স্থানীয় মানুষকে সতর্ক করা, হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং হাতিকে নিরাপদে বনে ফেরাতে বন বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাতি-মানুষের সংঘাত কমাতে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমও কাজ করছে। বিভিন্ন এলাকায় সোলার ফেন্সিং ও বায়োফেন্সিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু হাতি তাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যার সমাধান করা কঠিন। বরং কেন হাতি লোকালয়ে আসছে, সেই কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
বনে পর্যাপ্ত খাবার না থাকলে হাতি খাবারের সন্ধানে মাঠে আসবে। চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হলে বিকল্প পথ খুঁজবে। সেই পথ যদি মানুষের বসতি বা কৃষিজমির মধ্য দিয়ে যায়, তাহলে সংঘাতের সম্ভাবনাও বাড়বে।
তাই হাতির স্বাভাবিক আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংরক্ষণ, বনাঞ্চলে খাদ্যের উৎস বাড়ানো এবং সীমান্তবর্তী মানুষের জন্য আগাম সতর্কতাব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
মানুষও থাকবে, হাতিও থাকবে
গারো পাহাড়ের পাদদেশে মানুষের বসতি ও কৃষিজমি থাকবে—এটাই বাস্তবতা। একই সঙ্গে পাহাড়ে বন্যহাতির বিচরণও থাকবে। তাই এক পক্ষকে সরিয়ে দিয়ে অন্য পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থার, যেখানে হাতির চলাচলের পথ চিহ্নিত ও সুরক্ষিত থাকবে, বনে পর্যাপ্ত খাদ্য থাকবে এবং লোকালয়ের কাছাকাছি হাতির উপস্থিতি দেখা দিলে দ্রুত মানুষকে সতর্ক করা যাবে।
হাতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দ্রুত ও সহজ প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে কৃষকের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি হাতি ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি ব্যবহারের প্রবণতা কমতে পারে।
সীমান্তের হাতির জন্য সীমান্তপারের উদ্যোগ
গারো পাহাড়ের হাতির চলাচল বাংলাদেশের সীমান্তে এসে থেমে যায় না। ভারতের মেঘালয় অঞ্চলের সঙ্গে তাদের বিচরণক্ষেত্রের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এই হাতি সংরক্ষণে সীমান্তের দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
হাতির চলাচলের পথ মানুষের তৈরি সীমারেখা মানে না। তাই বন্যহাতির স্বাভাবিক বিচরণ ও আবাসস্থলকে বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।
হাতির জন্য নিরাপদ পথ, মানুষের জন্য নিরাপদ রাত
বিশ্ব হাতি দিবসে শেরপুরের গারো পাহাড়ের গল্পটি শুধু হাতিকে বাঁচানোর গল্প নয়; এটি মানুষকেও নিরাপদ রাখার গল্প।
যে কৃষক কয়েক মাস পরিশ্রম করে ধান ফলান, তার ফসল রক্ষা করতে হবে। যে হাতি পাহাড়ের পথ ধরে খাবারের সন্ধানে চলে, তার আবাসস্থল ও চলাচলের পথও রক্ষা করতে হবে।
হাতিকে বাঁচাতে হলে শুধু হাতিকে নয়, তার বন, খাদ্য ও চলাচলের পথকে বাঁচাতে হবে। আর মানুষকে নিরাপদ রাখতে হলে শুধু হাতি তাড়ালেই হবে না; মানুষ ও হাতির সংঘাতের কারণগুলোও কমাতে হবে।
গারো পাহাড়ে এমন একটি সকাল আসুক, যখন কৃষক ধানখেতের দিকে তাকিয়ে ফসলের স্বপ্ন দেখবেন, হাতির আতঙ্ক নয়। এমন একটি রাত আসুক, যখন পাহাড় থেকে হাতির চলাচলের শব্দ ভেসে এলেও সীমান্তের মানুষ আতঙ্কে ঘুম হারাবেন না।
পাহাড়ে হাতির চলাচল থাকবে, পাহাড়ের পাদদেশে মানুষের ঘরও থাকবে—দুইয়ের মাঝখানে তৈরি হোক নিরাপদ সহাবস্থানের পথ।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কাজী মুহাম্মদ নূরুল করিম দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’কে বলেন, শেরপুরের গারো পাহাড়ে শতাধিক বন্যহাতির বিচরণ রয়েছে। এসব হাতিকে রক্ষা করার পাশাপাশি মানুষকেও নিরাপদ রাখতে হবে। হাতি-মানুষের সংঘাত কমাতে হাতির আবাস ও বিচরণস্থল নিশ্চিত করার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত পদ্ধতিতে কাজ করা হচ্ছে। হাতির স্বাভাবিক চলাচলে বাধা বা তাদের বিরক্ত না করার বিষয়ে স্থানীয় মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। হাতির কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রয়েছে।