মোঃ রায়হান হোসেন, বেনাপোল (যশোর)
প্রকাশ: ১১:৫০, ১১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১২:১৬, ১১ অক্টোবর ২০২৬
বেনাপোল স্থলবন্দরের ৪১ নম্বর শেড থেকে চার ট্রাক পণ্য খালাসকে কেন্দ্র করে শুল্ক ফাঁকি ও অনিয়মের গম্ভীর অভিযোগ উঠেছে। চার ট্রাক পণ্যের মধ্যে দুই ট্রাক বন্দর থেকে বের করে ঢাকার সদরঘাটের কোতোয়ালি থানাধীন একটি গুদামে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে গোয়েন্দা সংস্থার অভিযানে সাড়ে ৭ কোটি টাকা মূল্যের পণ্যগুলো আটক করা হয়। এ ঘটনায় বন্দর থেকে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া, কাস্টমসের তদারকি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
বেনাপোল কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কাস্টমস হাউজের যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দীন মিঞা ৪১ নম্বর শেডের চার ট্রাক পণ্যের মধ্যে দুই ট্রাক মালামাল সরিয়ে নেওয়ার খবর পান। এই চালানের সাথে ঢাকার সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান ‘গ্রিন ওয়ে ইন্টারন্যাশনাল’ এবং যশোরের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স আবিদ ইন্টারন্যাশনাল’ সংশ্লিষ্ট ছিল।
সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট শেডে থাকা পণ্যগুলোর দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরমান হোসেন, ট্রাফিক পরিদর্শক মামুনুর রশীদ এবং সহকারী শেড ইনচার্জ আশরাফুল আলম। তবে দুই ট্রাক পণ্য বন্দর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরমান হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, ঘটনার সময় তিনি অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাস্টমস হাউজের এক কর্মকর্তা জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে এই অনিয়মে সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কাকতালীয়ভাবে, ঘটনাটি ঘটে ওই কর্মকর্তার বেনাপোল কাস্টমস হাউজে শেষ কর্মদিবসের দিনে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বর্তমানে ৪১ নম্বর শেডে আরও দুই ট্রাক পণ্য অবস্থান করছে। ব্যবসায়ীরা প্রশ্ন তুলেছেন—চার ট্রাক পণ্য কীভাবে কাস্টমসের চোখ ফাঁকি দিয়ে খালাস করা হলো, দুই ট্রাক কীভাবে ঢাকায় পৌঁছে গেল এবং পরে গোয়েন্দা তথ্যে আটক হলো? এই পুরো চক্র ও অনিয়মের তদন্ত দাবি করেছেন তারা।
কম শুল্কের ঘোষণায় উচ্চ শুল্কের পণ্য
বেনাপোল স্থলবন্দরে কম শুল্কযুক্ত পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য খালাস নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, সঠিক শুল্কায়ন এড়াতে এক পণ্যের কাগজপত্রে অন্য পণ্য খালাস নেওয়া হয়।
নিয়ম অনুযায়ী, পণ্যের কাগজপত্র কায়িক পরীক্ষা ও যথাযথ শুল্কায়ন শেষে খালাস হওয়ার কথা থাকলেও অনেক সময় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়াই মাত্র ৪০ থেকে ৫০ মিনিটের মধ্যে ট্রাক বন্দর ছেড়ে যায়। এই দ্রুত খালাসের পেছনে অনিয়ম ও লেনদেনের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, "বন্দরে অনিয়ম হলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারায়। এই শুল্ক ফাঁকির ঘটনা সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে খালাস প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো জরুরি।"
বেনাপোল স্থলবন্দর উপপরিচালক রুহুল আমিন বলেন, "বন্দরের নিরাপত্তা ও খালাস কার্যক্রম সুশৃঙ্খল রাখতে আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছি। যেকোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
বেনাপোল কাস্টমস হাউজ সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন বলেন, "পণ্যের সঠিক শুল্কায়ন নিশ্চিত করতে কাস্টমস সতর্ক রয়েছে। অনিয়ম ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে; সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।