মো: রিয়াজ উদ্দিন, লামা (বান্দরবান)
প্রকাশ: ১২:১২, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয় ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানানো হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন নেই। তাঁদের আশঙ্কা, যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশের পরও অগ্রগতি কোথায়?
গত ১১ মে ২০২৬ তারিখে বর্তমান সরকারের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ অংহ্লারী পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। এ সময় লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন, জেলা শিক্ষা অফিসারসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনকালে বিদ্যালয়ের ভবনের অবস্থা দেখে প্রতিমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা এবং নতুন ভবন নির্মাণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে।
কিন্তু পরিদর্শনের প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও কার্যকর পদক্ষেপের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাঁদের প্রশ্ন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার পরও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেন কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়? দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কি কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেবেন?
‘ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে না’—প্রধান শিক্ষকের বক্তব্যে বিতর্ক
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এথোয়াই মার্মার কাছে ভবনটির নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার দৃষ্টিতে এই ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে না। ভবন পরিত্যক্ত করলে অনেক ঝামেলা আছে। আপনারা কি এই বিষয়ে আমার চেয়ে বেশি বুঝবেন নাকি? এই বিষয়ে আমি কোনো বক্তব্য দিতে পারব না। আপনারা কোনো নিউজ-টিউজ করিয়েন না।”
প্রধান শিক্ষকের এমন বক্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ভবনটি নিরাপদ কি না, তা কি ব্যক্তিগত ধারণার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে, নাকি সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগ ও শিক্ষা কর্তৃপক্ষের কারিগরি মূল্যায়নের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—এমন প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান হিসেবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, অভিভাবকদের উদ্বেগ এবং বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সমস্যার বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশিত। সেখানে ভবন পরিত্যক্ত করার বিষয়টিকে ‘ঝামেলা’ হিসেবে উল্লেখ করার বক্তব্য নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে ভবনটির প্রকৃত ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারিগরি পরীক্ষা ও লিখিত মূল্যায়ন জরুরি। তদন্তের মাধ্যমে ভবনের বর্তমান অবস্থা এবং এ বিষয়ে আগে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
ভয়ের মধ্যেই পাঠদান, উদ্বিগ্ন শিক্ষকেরা
বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষকেরা জানান, ভবনের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁরা অনেকটা ভয়ের মধ্য দিয়েই পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত ভবনটির বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।
একদিকে প্রধান শিক্ষকের বক্তব্যে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ নয় বলে দাবি করা হচ্ছে, অন্যদিকে অন্য শিক্ষকদের উদ্বেগ পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি জানায়। এমন অবস্থায় অনুমান বা ব্যক্তিগত মতামতের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত নিরপেক্ষ কারিগরি পরীক্ষা করাই সবচেয়ে জরুরি।
নতুন সভাপতি, আশ্বাস দিলেও প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগ
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি রমিজ উদ্দিন রনি বলেন, “আমি সবেমাত্র দায়িত্ব গ্রহণ করেছি এবং বিস্তারিত এখনো অবগত নই। স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে ইনশাআল্লাহ আমার পক্ষ থেকে চেষ্টা চালিয়ে যাব।”
নতুন সভাপতির এই আশ্বাসকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। তবে তাঁদের মতে, শুধু আশ্বাস নয়—শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ, ভবনের অবস্থা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে দৃশ্যমান উদ্যোগ দরকার।
বরাদ্দের অর্থ ব্যবহারে অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
বিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক কিছু বরাদ্দের ব্যবহার নিয়েও নয়ছয়ের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও কয়েকজন অভিভাবক। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য সামনে আসেনি।
এ অবস্থায় বিদ্যালয়ের বরাদ্দসংক্রান্ত নথিপত্র, ব্যয়ের হিসাব ও বাস্তব কাজের অবস্থা যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনারও দাবি উঠেছে।
দুর্ঘটনার পর নয়, আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
এলাকাবাসীর বক্তব্য, শিশুদের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের অবহেলা কাম্য নয়। ভবনটি প্রকৃতপক্ষে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা নিয়ে মতভেদ থাকলে দ্রুত প্রকৌশলগত পরীক্ষা করাতে হবে। পরীক্ষার ফল অনুযায়ী ভবনটি ব্যবহারযোগ্য কি না, তা নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ প্রমাণিত হলে ভবনটি ব্যবহার বন্ধ, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ বিকল্প স্থানে পাঠদান এবং নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ জরুরি।
এখন প্রশ্ন—শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর পরিদর্শন ও নির্দেশনার পরও কেন অংহ্লারী পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই? শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও প্রকৌশল বিভাগ কবে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে?
প্রধান শিক্ষক এথোয়াই মার্মার ভূমিকা, ভবনের প্রকৃত অবস্থা এবং বরাদ্দ ব্যবহারের অভিযোগ—সব বিষয়েই প্রয়োজন নিরপেক্ষ যাচাই ও জবাবদিহি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে দায়ী করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে ওঠা উদ্বেগ উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
এলাকাবাসীর দাবি স্পষ্ট—দুর্ঘটনার অপেক্ষা নয়, এখনই নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে কোনো ঝুঁকি নয়; অংহ্লারী পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নিয়ে দ্রুত তদন্ত, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং নতুন ভবন নির্মাণের কার্যকর উদ্যোগ চান তাঁরা।