মোঃআহছান উল্লাহ,কুমিল্লা
প্রকাশ: ২২:২৮, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
নগরীর মোগলটুলী এলাকার ফারুকী হাউজে অবস্থিত দলীয় কার্যালয়ে ঘটা এই ঘটনায় মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমানের ব্যক্তিগত গাড়ি ভাঙচুর এবং কার্যালয়ের ছাদে উপর্যুপরি ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটেছে, যা দলটির ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
ঘটনার মূল সূত্রপাত কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আসন্ন নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে। দলীয় নিয়ম অনুযায়ী আমির ও সেক্রেটারি নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও বেশ কিছুদিন ধরে শীর্ষ নেতাদের মধ্যে চরম মতবিরোধ চলছিল। বর্তমান সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমান নতুন কমিটিতে 'আমির' বা শীর্ষ পদ লাভ করতে পারেন—এমন একটি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে দলের একাংশের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। বিরোধী শিবিরের একাংশের অভিযোগ, মাহবুবুর রহমান একচেটিয়াভাবে নিজের প্রভাব খাটিয়ে ও নিজস্ব অনুসারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর চেষ্টা চালাচ্ছিলেন।
বুধবার সন্ধ্যায় দলীয় কার্যালয়ে কমিটি গঠন ও প্যানেল চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলছিল। দলীয় একাধিক গোপন সূত্র নিশ্চিত করেছে, বুধবার রাতেই নতুন কমিটি গঠনের জন্য একটি অভ্যন্তরীণ ভোট গ্রহণের জোরদার সম্ভাবনা ও প্রস্তুতি ছিল।
এই ভোট গ্রহণের খবর পেয়ে এবং সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমান তাঁর নিজের অনুসারীদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অতিরিক্ত সংখ্যায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন—এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়লে বিরোধী পক্ষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। সহ-সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন ও দাওয়াহ ও তথ্য সম্পাদক হোসেনের নেতৃত্বাধীন একটি পক্ষ বৈঠকটি প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নেয়। সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে তাদের অনুসারী একদল নেতাকর্মী লাঠিসোঁটা নিয়ে ফারুকী হাউজে প্রবেশ করে এবং হট্টগোল শুরু করে।
সাধারণত জামায়াতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের খবর বাইরে ছড়ায় না, তবে বুধবার সন্ধ্যার ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বৈঠক চলাকালেই কার্যালয়ের সামনে পার্ক করে রাখা সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমানের ব্যক্তিগত গাড়িটির ওপর হামলা চালায় ক্ষুব্ধ বিরোধী পক্ষ। তারা রড ও লাঠি দিয়ে গাড়ির কাচ ও বডি ব্যাপক ভাঙচুর করে।
একই সময়ে ভেতরের বৈঠককে পণ্ড করতে এবং আতঙ্ক তৈরি করতে কার্যালয়ের ছাদে পর পর কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ককটেলের বিকট শব্দে পুরো মোগলটুলী এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ দিকবিদিক ছুটোছুটি শুরু করে। দলটির তৃণমূল কর্মীরাও এমন পরিস্থিতিতে হতবাক হয়ে পড়েন।
পরিস্থিতি সম্পূর্ণ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকেই সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমান নিজেই কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) সরাসরি ফোন করেন এবং দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও নিজের গাড়ি ভাঙচুরের কথা জানিয়ে দ্রুত পুলিশ মোতায়েনের অনুরোধ করেন।
একটি সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দলটির সেক্রেটারি কর্তৃক সরাসরি পুলিশ ডাকার ঘটনাকে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি বিশাল দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে এবং ফারুকী হাউজ অবরুদ্ধ করে ফেলে।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর থেকে দলের সম্মান রক্ষার্থে ও ঘটনা ধামাচাপা দিতে সব পক্ষই গণমাধ্যমের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে। গাড়ি ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা সহ-সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিনকে তাঁর অবস্থান ও অভিযোগের সত্যতা জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এমনকি ঘটনার মূল ভুক্তভোগী সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমানও পুলিশের সুরক্ষায় থাকার পর পরবর্তীতে আর গণমাধ্যমের ফোন রিসিভ করেননি।
ঘটনার পর রাত বাড়ার সাথে সাথে কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মোশাররফ হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি স্বীকার করলেও ধামাচাপা দেওয়ার সুরে বলেন,এটা আমাদের সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিষয়। ভেতরে আমাদের ঊর্ধ্বতন নেতাদের নিয়ে মিটিং ও আলোচনা চলছে। আমরা বিষয়টি নিজেরা সমাধান করে পরবর্তীতে মিডিয়া ব্রিফিং দেব।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার পরিস্থিতি নিশ্চিত করে বলেন, ঘটনাটি শোনার পরপরই আমরা দ্রুত ফোর্স পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছি। ভেতরে জামায়াতের ঊর্ধ্বতন নেতারা এখনো আছেন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ এড়াতে ফারুকী হাউজের বাইরে ও মোগলটুলী এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
কুমিল্লার রাজনৈতিক সচেতন মহল মনে করছেন, এই ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ কমিটি গঠন নিয়ে দ্বন্দ্ব নয়, বরং এটি কুমিল্লা জামায়াতের দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের লড়াইয়ের বহিঃপ্রকাশ। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের ধারণা, এই ঘটনার পর কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের ভেতরের ফাটল আরও স্পষ্ট হবে এবং আগামীতে দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল আরও জটিল রূপ নিতে পারে।