মোঃআহছান উল্লাহ,কুমিল্লা
প্রকাশ: ১৭:২৪, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
জেলা পুলিশের মিডিয়া শাখা থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ নির্ভরযোগ্য অভ্যন্তরীণ দাপ্তরিক হিসাব অনুযায়ী,পূর্ববর্তী সাত দফায় আটক হওয়া ২,৮১১ জনসহ চলমান এই চিরুনি অভিযানে জেলাজুড়ে এ পর্যন্ত সর্বমোট ৩,৩৩০ জনকে আটক করা হয়েছে।তবে চলমান এই মেগা ড্রাইভের সবচেয়ে বড় যে তথ্যটি এখনও কোনো মূলধারার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি,তা হলো আটককৃতদের জবানবন্দি ও মোবাইল ফোনের ফরেনসিক ডেটা ব্যবহার করে কুমিল্লায় সক্রিয় অন্তত ২৫টি আন্ডারগ্রাউন্ড কিশোর গ্যাংয়ের প্রায় সাড়ে তিন হাজার সদস্যের একটি স্থায়ী 'ডিজিটাল ক্রাইম প্রোফাইল বা ডাটাবেজ' তৈরি করছে পুলিশ, যা পরবর্তীতে তাদের নিখুঁত নজরদারিতে রাখতে সহায়তা করবে।
জেলা গোয়েন্দা শাখা এবং তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোপন সূত্রে জানা গেছে,সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লায় একাধিক হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে পুলিশ শহর ও বিভিন্ন উপজেলায় সক্রিয় পিএক্স ১০, ১২০৭,সিবিক,মডার্ন ওরকস্টারসহ অন্তত ২৫টি অদ্ভুত নামের কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব খুঁজে পায়।ডিবির কাউন্টার-গ্যাং উইংয়ের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর মডাস অপারেন্ডি,যা কোনো মিডিয়ায় আসেনি। এসব গ্রুপ মূলত প্রথমে ফেসবুক বা টিকটকে মানুষের মনে ভীতি বা ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে এমন অদ্ভুত সব ডিজিটাল কোড বা নাম দিয়ে ভার্চুয়াল গ্রুপ খোলে।পরবর্তীতে গ্রুপগুলোর নাম দেখেই যাতে অন্য অপরাধী চক্র বুঝতে পারে যে এর পেছনে কোন স্থানীয় 'বড় ভাই' বা গডফাদার রয়েছে,সেই উদ্দেশ্যে এসব সাঙ্কেতিক নাম ব্যবহার করা হয়।ভার্চুয়াল দুনিয়ার এই টিকটক ও ফেসবুক গ্রুপগুলোই একপর্যায়ে মাঠপর্যায়ে মাদক চোরাচালান, ছিনতাই এবং রাজনৈতিক ক্যাডার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে কোল্ড ব্লাডেড অপরাধ চক্রে রূপ নেয়,যা দমনেই এই ব্যাপক ব্লক রেইডের ছক সাজানো হয়।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ অভিযানের খতিয়ান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া এই জিরো-টলারেন্স অভিযানের প্রথম পাঁচ দফায় জেলাজুড়ে দুই হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছিল। এরপর গত ৮ অক্টোবর ষষ্ঠ দফার অভিযানে এক রাতেই ২৫২ জন এবং ১১ অক্টোবর সপ্তম দফার অভিযানে জেলার বিভিন্ন স্পট থেকে আরও ৩৫৩ জনকে আটক করা হয়।সর্বশেষ ১৫ অক্টোবর রাতে পরিচালিত অষ্টম দফার সমন্বিত অভিযানে রেকর্ডসংখ্যক ৫১৯ জন আটক হয়।নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে,আটককৃত ৩,৩৩০ জনের মধ্যে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই ও সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের ডিজিটাল প্রমাণ পাওয়ায় প্রায় ৯০০ জনকে ইতিমধ্যে বিভিন্ন নিয়মিত মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।বাকিদের অপরাধের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় এবং তারা কেবল ভার্চুয়াল গ্রুপের প্রাথমিক স্তরে থাকায় কঠোর মুচলেকা ও মনস্তাত্ত্বিক সতর্কীকরণের মাধ্যমে তাদের নিজ নিজ অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মোঃআনিসুজ্জামান, পিপিএমের সরাসরি নির্দেশনায় পরিচালিত এই অভিযানে কোনো নিরপরাধ শিক্ষার্থী বা সাধারণ পথচারী যেন অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে।জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের মিডিয়া সেল থেকে জানানো হয়েছে,প্রতিটি আটকের পর স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং পরিবারের উপস্থিতিতে প্রযুক্তির সহায়তায় অপরাধের রেকর্ড পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হচ্ছে।জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটি স্পষ্ট করা হয়েছে যে,পর্দার আড়ালে থাকা রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো পৃষ্ঠপোষক বা গডফাদারের তোয়াক্কা না করে কুমিল্লার প্রতিটি পাড়া-মহল্লা থেকে কিশোর গ্যাং কালচারের শিকড় উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত এই বিশেষ চিরুনি অভিযান ও ব্লক রেইড কঠোরভাবে অব্যাহত রাখা হবে।