মো. সামিউল ইসলাম, জবি
প্রকাশ: ১১:৪৬, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচন। কেন্দ্রীয় সংসদে ভিপি, জিএস, এজিএসসহ মোট ২১টি পদের মধ্যে ১৬টি পদে জয়ী হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেল। এছাড়াও, একমাত্র ছাত্রী হল নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী হল সংসদেও একচেটিয়া জয় পায় ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল।
আট মাসে জকসুর উদ্যোগে মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়ন, অ্যাম্বুলেন্স প্রদান, মেডিকেল ক্যাম্প, আন্তর্জাতিক শিক্ষা মেলা, ফ্রি আইইএলটিএস, গ্রাফিকস ডিজাইন ও বেসিক কম্পিউটার কোর্স, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি সংস্কার, বাসে ফ্রি ইন্টারনেট সেবা এবং আইন অনুষদে ডিএলআর চালুসহ নানাবিধ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট ও ক্যাফেটেরিয়া সংস্কারের মতো মৌলিক সমস্যার সমাধান প্রক্রিয়া এখনও আলোর মুখ দেখেনি।
লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী সিয়াম হোসাইন বলেন, ‘৮ মাসে জকসু তাদের ইশতেহার অনুযায়ী কিছু কাজ বাস্তবায়ন করেছে। তবে আমাদের মূল সমস্যা আবাসন সংকট নিয়ে তাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা দেখা যায়নি।’
ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়ামিন হোসাইন বলেন, ‘জকসুর উদ্যোগে আন্তর্জাতিক শিক্ষা মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। এতে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে। এর বাইরে তারা বিনামূল্যে বেসিক আইটি কোর্স ও আইইএলটিএস কোর্সের আয়োজনও করেছে। তবে আমাদের আবাসন-সংক্রান্ত সমস্যা চরমে। এর সমাধানে জকসুর আরও বেশি তৎপর হওয়া উচিত।’
জকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও জবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আবদুল আলিম আরিফ বলেন, ‘আমরা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের আবাসন নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলছি। দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজ সেনাবাহিনীর হাতে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছি।’
জকসুর সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মাসুদ রানা বলেন, ‘দ্বিতীয় ক্যাম্পাস ও সম্পূরক বৃত্তির দ্বিতীয় কিস্তির টাকা প্রদানের দাবিতে আমরা সব সময় সরব। নিয়মিত হলগুলোর কাজের খোঁজখবর নিচ্ছি। সর্বশেষ আবাসনের দাবিতে আন্দোলনে গিয়েই আমরা ছাত্রদলের হামলার শিকার হয়েছি।’
মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়ন ও অ্যাম্বুলেন্স প্রদান :
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩টি আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম জবি মেডিকেল সেন্টারে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব সরঞ্জামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ৪০টিরও বেশি মেডিকেল পরীক্ষা বিনামূল্যে করার সুযোগ পাচ্ছেন। গত ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আধুনিকায়ন করা মেডিকেল সেন্টারটি যৌথভাবে উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদদীন এবং জকসুর ভিপি মো. রিয়াজুল ইসলাম। এছাড়াও, এর আগে জকসুর উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অত্যাধুনিক অ্যাম্বুলেন্সও প্রদান করা হয়।
দ্বিতীয় ক্যাম্পাস ও অস্থায়ী আবাসন নির্মাণে প্রশাসনের গড়িমসির অভিযোগ জকসুর :
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা আবাসন সংকট। রাজধানীর পুরান ঢাকায় প্রায় সাত একর জমিতে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সাতটি অনুষদ, দুটি ইনস্টিটিউট ও ৩৮টি বিভাগের ১৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ভাড়া বাসাবাড়ি কিংবা মেসে থেকে পড়াশোনা করছেন। তবে ঢাকার কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ায় প্রায় ২০০ একর জমিতে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি একই প্রকল্পের আওতায় পুরান ঢাকায় বাণী ভবন ও ড. হাবিবুর রহমান হল নির্মাণাধীন।
তবে এসব কাজ বাস্তবায়নে ব্যাপক ধীরগতি দেখা দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে জকসুর ভিপি মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের অস্থায়ী আবাসন নির্মাণের জন্য ২০ কোটি টাকা এসেছে কয়েক মাস হয়ে গেল। কিন্তু এখন পর্যন্ত আবাসন নির্মাণকাজ শুরু করার কোনো লক্ষণ আমরা দেখছি না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মেসজীবনের অবর্ণনীয় কষ্ট যেন কষ্টই থেকে যাচ্ছে।’
নানা সমস্যায় জর্জরিত একমাত্র ছাত্রী হল :
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্রী হল নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী হলের ক্যান্টিনে খাবারের নিম্নমান, মেডিকেল সেন্টার ও জিমনেসিয়াম না থাকা এবং আসনসংখ্যার অপ্রতুলতাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আসন না থাকা সত্ত্বেও ছাত্রদলের সুপারিশে অনেককে হলে উঠানো হচ্ছে, যার ফলে আবাসন-সংক্রান্ত সমস্যা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত হল সংসদের ভিপি জান্নাতুল উম্মি তারিন দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, ‘ক্যান্টিন পরিচালকের গাফিলতির কারণেই ক্যান্টিনের খাবারের মানের উন্নতি হচ্ছে না। ইতোমধ্যে তাকে সরিয়ে দিয়ে নতুন পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে আমরা শিক্ষার্থীদের গণস্বাক্ষর নিয়েছি। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ, শিগগিরই এ মৌলিক সমস্যার সমাধান হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রশাসন থেকে কেন্দ্রীয় সংসদ কিছু টাকা বরাদ্দ পেলেও আট মাসে হল সংসদ এখনও কোনো বরাদ্দ পায়নি। জিমনেসিয়ামের জন্য নিজস্ব উদ্যোগে সরঞ্জামের ব্যবস্থা করলেও হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের নির্দিষ্ট কোনো কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এর বাইরে আমরা কমনরুমে ওয়াশরুম স্থাপন, বিভিন্ন দিবসকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান, ফ্রি কোর্স বাস্তবায়নসহ নানা শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছি। এছাড়াও, প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে হলের সামনের রাস্তা পাকা করার ব্যবস্থা করেছি, যা শিগগিরই উদ্বোধন করা হবে।’
অন্যান্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মতামত :
জকসুর কার্যক্রম নিয়ে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদি হাসান হিমেল বলেন, ‘জকসু নেতারা শিক্ষার্থীদের কল্যাণে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ করেননি। তাদের কাজ ফেসবুকেই বেশি।’
শাখা ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক মো. শাহিন মিয়া বলেন, ‘মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়নসহ জকসু কিছু শিক্ষার্থীবান্ধব কাজ করেছে। তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জকসুকে ঘিরে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখনও পূরণ হয়নি। আবাসনের মতো প্রধান সংকট নিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কার্যত নির্বিকার। তাদের আরও সোচ্চার হওয়া দরকার।’