আবু তাহের, নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ: ১৬:০৬, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রথম সংঘর্ষ: গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলে বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ নেতার অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
রাত ১২টার দিকে বিদ্রোহী হলের সামনে সিনিয়র ও জুনিয়রদের মধ্যে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রথম দফার সংঘর্ষে মারধরের শিকার হয়ে আহত অবস্থায় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহজালাল আহমেদ জনি।
এর কয়েক ঘণ্টা পর বুধবার (২৯ জুলাই) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্নিবীণা হলের ডাইনিংয়ে দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ডাইনিংয়ে খাবার খাওয়ার সময় ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল কর্মী রিজওয়ানুল করিম রাব্বী এক পক্ষের হামলার শিকার হন। পরে আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ফুটেজে হামলাকারীদের হাতে লাঠি ও লোহার রড দেখা যায়।
এই হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছুক্ষণ পর উভয় পক্ষ অগ্নিবীণা ও বিদ্রোহী হলের সামনে মুখোমুখি হলে তৃতীয় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
জানা যায়, রিজওয়ানুল করিম রাব্বী পূর্বে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার করে। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তীতে ছাত্রলীগের পরিচয় পাল্টে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
দ্বিতীয় সংঘর্ষ: গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) শাখা ছাত্রদলের দুই গ্রুপের মধ্যে ফের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। শাখার আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব ও সদস্য সচিব মামুন সরকারের অনুসারীদের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। এতে গুরুতর আহত হন নাট্যকলা ও পরিবেশনা বিদ্যা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তানজীম লাবিব।
রাতে অগ্নিবীণা হলের সামনে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় লাবিব মাথায় আঘাত পেয়ে গুরুতর আহত হলে তাকে ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার মাথায় ছয়টি সেলাই দেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও একাধিক সূত্রের ভাষ্য, ঘটনার সূত্রপাত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ভবনের সামনে। সেখানে প্রকাশ্যে গাঁজা খাওয়ার বিষয়কে কেন্দ্র করে সদস্য সচিবের অনুসারী রাশেদুল হাসান রাতুল চারুকলা বিভাগের দুই শিক্ষার্থীকে জেরা করেন। পরে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। ওই দুই শিক্ষার্থী আহ্বায়ক হাবিবের অনুসারী বলে জানা যায়।
এরপর আহ্বায়ক হাবিবের একটি মিছিলে এ ঘটনার জের ধরে রাতুল ও সদস্য সচিবের অন্যান্য অনুসারীদের সঙ্গে আবারও বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তি হয়।
ঘটনার সময় সদস্য সচিব মামুন সরকারকে নিয়ে কটু কথা বলার অভিযোগে বিদ্রোহী হল থেকে যুগ্ম আহ্বায়ক ইনানকে অগ্নিবীণা হলের সামনে নিয়ে আসেন সদস্য সচিব ও তার অনুসারীরা। পরে অগ্নিবীণা হলের সামনে আহ্বায়ক হাবিবের অনুসারীরা উপস্থিত হলে দুই পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষ শুরু হয়।
এ সংঘর্ষ উসকে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে শাখা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক শাহাবুল আলম ও সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে।
সংঘর্ষের পর এক পক্ষ অগ্নিবীণা হল এবং অন্য পক্ষ বিদ্রোহী হলে অবস্থান নেয়। এ সময় ক্যাম্পাসজুড়ে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করে। পরে প্রক্টরিয়াল বডির উপস্থিতিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
তৃতীয় সংঘর্ষ: বুধবার (১৪ অক্টোবর) নজরুল প্রিমিয়ার লীগ (এনপিএল) টুর্নামেন্ট চলাকালে অন্য গ্রুপের বল সীমানায় আসাকে কেন্দ্র করে কয়েক দফা সংঘর্ষে জড়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে ছয় শিক্ষার্থী গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে এনপিএল চলাকালে ঘটনার সূত্রপাত হয়। পরে খেলার মাঠ, অগ্নিবীণা হলের সামনে, কলা ভবনের সামনে ও পেছনে চার দফায় সংঘর্ষ হয়। আহত ছয় শিক্ষার্থীর চারজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে আরও দুইজনকেও সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, এনপিএল চলাকালে খেলার মাঠের বাউন্ডারির ভেতরে বল চলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে টুর্নামেন্টের আয়োজক ও বাউন্ডারির কাছে ফুটবল খেলতে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথমে বাকবিতণ্ডা ও গালিগালাজ হয়। পরে খেলা শেষ হওয়ার পর বিরোধ মীমাংসার জন্য দুই পক্ষ একসঙ্গে হলে আবারও বাকবিতণ্ডা থেকে হাতাহাতি শুরু হয়।
এ সময় ইংরেজি ও ভাষা সাহিত্য বিভাগের ১৬ ব্যাচের শুভকে ২০ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী চড় মারেন বলে অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ ওঠে, এর প্রতিশোধ নিতে অগ্নিবীণা হল ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের সামনে এনপিএল আয়োজক কমিটির সিফাত, নাসিম ও আরেক খেলোয়াড়কে লাঠিসোঁটা দিয়ে মারধর করেন মাঠে ফুটবল খেলতে আসা ইংরেজি এবং লোকপ্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থীরা। পরে হামলাকারীরা কলা ভবনের সামনে অবস্থান নেন।
এরপর ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী ও আয়োজক কমিটির সদস্য সিফাতের নেতৃত্বে প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী কলা ভবনের সামনে গেলে প্রক্টরের উপস্থিতিতেই দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পরে কলা ভবনে অবস্থান নেওয়া ইংরেজি ও লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীদের গ্রুপটি সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
পরে তাদের খুঁজতে গিয়ে কলা ভবনের পেছনে তিনজনকে পাওয়া যায়। সেখানে তাদের রড ও স্ট্যাম্প দিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. মাহবুবুর রহমান ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে তার সঙ্গেও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ সময় মারধরের ভিডিও ধারণ করতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরটিভি নিউজের সংবাদদাতা আবু তাহেরের ওপরও চড়াও হন কয়েকজন শিক্ষার্থী। অভিযোগ রয়েছে, তার ফোন কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক ভিডিও মুছে ফেলা, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
পরে আহত ইংরেজি, লোকপ্রশাসন ও চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী রবিউল, সাকিব, রাফি ও রোমানকে ত্রিশাল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। অপর পক্ষের দিদারুল ইসলাম আঘাত পেয়ে ত্রিশাল মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি হন এবং সিফাত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন বলে জানা যায়।
এ ঘটনায় সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
পরপর তিনটি সংঘর্ষে শিক্ষার্থীদের আহত হওয়া, অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা ব্যবহারের অভিযোগ এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে সংঘর্ষের সময় প্রক্টরিয়াল বডির ভূমিকা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের সক্ষমতা এবং সংঘর্ষের আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
সংঘর্ষ এড়াতে ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আলম বলেন, সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে সংঘর্ষ এড়াতে প্রথমে বিভাগগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে। বিভাগের শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং করা হলে এটি বেশি কার্যকর হবে। কারণ শিক্ষার্থীরা বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং শিক্ষকদের প্রতি তাদের যথেষ্ট সম্মান রয়েছে। শিক্ষকরা নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সচেতন করবেন, যাতে তারা কোনো ধরনের সংঘর্ষে না জড়ায়। সিনিয়ররা যেন জুনিয়রদের স্নেহ করে এবং জুনিয়ররা যেন সিনিয়রদের সম্মান করে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তর রয়েছে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা করার জন্য।