আমার পরিচিত মুখগুলোই আমাকে আঘাত করতেছিলো

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২০:০৪, ২০ অক্টোবর ২০২৬

আমার পরিচিত মুখগুলোই আমাকে আঘাত করতেছিলো

'এটা ইংলিশের, এটারেও ধর' বলেই আমার উপর হামলা করে। আমি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরও তারা আমাকে রড ও স্ট্যাম্প দিয়ে মারতে থাকে। আমার পরিচিত মুখগুলোই আমাকে আঘাত করতেছিলো ঠিক এভাবেই বর্ণনা করছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আহত হয়ে মাথা ফেটে যাওয়া ইংরেজি ও ভাষা সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী হোসাইন সাকিব। 

গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে চলছিল নজরুল প্রিমিয়ার লীগ (এনপিএল) ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। পাশেই ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা ফুটবল খেলছিলেন। এসময় খেলার মাঠের বাউন্ডারির ভেতরে বারবার ফুটবল চলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে টুর্নামেন্টের আয়োজক ও বাউন্ডারির কাছে ফুটবল খেলতে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথমে বাকবিতণ্ডা হয়। পরে খেলা শেষ হওয়ার পর বিরোধ মীমাংসায় দুই পক্ষ একসঙ্গে হলে আবারও বাকবিতণ্ডা থেকে হাতাহাতির শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে দুই পক্ষের শিক্ষার্থীরা অগ্নিবীণা হলের সামনে, কলা ভবনের সামনে এবং পেছনে কয়েক দফা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এতে ৬ জন শিক্ষার্থী আহত হন। আহত ৬ শিক্ষার্থীর চারজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে আরও দুইজনকেও মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়।

হোসাইন সাকিব নিজের সাথে ঘটে যাওয়া সেইদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমি বিদ্রোহী হল থেকে বন্ধুর সাথে বাইরে হাটতে বের হয়ে সিঙ্গারা হাউজের দিকে যাচ্ছিলাম, মূলত কী নিয়ে মারামারি হচ্ছিল, তা আমি জানতামই না। মাঠের ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি ব্যবস্থাপনা ও ফিন্যান্স বিভাগসহ আরো কয়েকটি বিভাগের ৯০-১০০ জন শিক্ষার্থী জড়ো হচ্ছেন। তাদের হাতে ছিল হাতুড়ি, স্ট্যাম্প, রড ও পাইপ ছিলো।

এ দৃশ্য দেখে আমি কলা ভবনের সামনে গিয়ে আমার বিভাগের কয়েকজনকে সতর্ক করি এবং ঝামেলা না করে চলে যেতে বলি। কথাটা বলেই আমি নিজের মতো চলে যাই। আমি হেটে একটু সামনে যাওয়া মাত্রই প্রক্টর স্যারের সামনেই ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীদের উপর আক্রমণ চালায়।

তখন আমি নির্মাণাধীন সায়েন্স ফ্যাকাল্টির ফুটপাত দিয়ে পেছনে গিয়ে দাড়ায়। সেখানে শুভ ভাই ও রবিউল ভাই আসেন। সেখান থেকেই তারা আমার বিভাগের শিক্ষার্থীদের খোঁজ খবর নিচ্ছিলেন এবং কার কেমন আঘাত লেগেছে তা জানার চেষ্টা করছিলেন।

ঠিক তখনই ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল আমাদের দিকে আক্রমণ করতে আসে। তাদের হাতে ছিল রড, স্ট্যাম্প ও হাতুড়ি। আমার সঙ্গে যারা ছিল তারা চারজন আগে আগে দৌড়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু শুরুতে আমি সেখান থেকে পালানোর কথাও ভাবিনি। কারণ, আমি কল্পনাও করিনি যে তারা আমাকে মারবে, তাও আবার মেরে ফেলার মতো করে মারবে। আমি সবার শেষে দৌড় দিই, যখন শুনতে পাই 'এটা ইংলিশের, এটারেও ধর!'

আমাকে মারবে এটা বুঝতে পেরেই আমি দৌড় দিই। কিন্তু তারা আমাকে ধরে ফেলে এবং কলাভবনের পেছনে ড্রেনের ওপর ফেলে আমাকে মারতে শুরু করে। তখনও আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, এই পরিচিত মুখগুলোই আমাকে আঘাত করছে!

আমার ডান হাতে ফোন ও ওয়ালেট ছিল। ড্রেনের ওপর পড়ে যাওয়ায় আমার ফোনটি ভেঙে যায়। তাদের মধ্যে একজন আমার কপাল বরাবর একটি রড দিয়ে আঘাত করে। পরপর তিনবার আঘাত করা হয়। আমি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাই। এরপরও তারা আমাকে রড ও স্ট্যাম্প দিয়ে মারতে থাকে।

নিজের উপর হামলাকারীদের নিয়ে তিনি বলেন, আমার উপর যারা হামলা করে তারা হলো ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী দিদারুল, রায়হান, মাসুদ রানা মুবিন, জিলানী, হেসাইন, আরিফ, মশিউর রহমান সাহান, রিয়াদ এবং ফিন্যান্স বিভাগের রায়হান তালুকদার ও নসিম।

পিঠ থেকে পা পর্যন্ত আঘাতের চিহ্ন ও রক্তে শরীর ভরে যাচ্ছিল। আমার নাক রক্তে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মুখে রক্ত যাওয়ার পর আমি আবার জ্ঞান ফিরে পাই।
ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী সিফাতের নেতৃত্বে এই হামলা হয়। আমি শুধুমাত্র ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী হওয়ায় তারা আমার উপর হামলা চালায়। 

তারপর আমার বিভাগের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহায়তায় প্রথমে আমাকে ত্রিশাল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এরপর ময়মনসিংহ মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সিটিস্কেন, এক্সরে করে ৪৮ ঘন্টা অবজারভেশনে রাখার পর আমাকে রিলিজ দেওয়া হয়।

বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সাকিব জানান, বর্তমানে আমি বাসায় আছি। তবে পেটানোর কারণে সারা শরীরে ব্যথা, ঘুমাতে পারছি না, মাথায় আঘাত নিয়ে ঘুমাতেও পারতেছি না, খেতেও পারতেছি না।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন