নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩:১০, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চলতি মাসের ১০ সেপ্টেম্বর নতুন সার ডিলার নিয়োগের আবেদনের শেষ দিন ছিল। এরপর থেকেই সচিবালয়ে তদবিরের তৎপরতা শুরু হয়। গত রোববার ও সোমবার কৃষিমন্ত্রীর দপ্তরের সামনে বিপুলসংখ্যক মানুষের ভিড় দেখা যায়। তাঁদের অধিকাংশই ডিলারশিপের বিষয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করেন। মঙ্গলবার মন্ত্রী ঢাকার বাইরে থাকায় তদবিরকারীদের একটি অংশ কৃষি সচিবের দপ্তরের সামনে অবস্থান করেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, সারা দেশে ৪ হাজার ৯৩১টি নতুন সার ডিলার নিয়োগের বিপরীতে মোট ৪৬ হাজার ৯৫৫টি আবেদন জমা পড়েছে। অর্থাৎ প্রতি ডিলারশিপের বিপরীতে গড়ে প্রায় ১০টি আবেদন পড়েছে।
আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ
ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক তদবিরের পাশাপাশি অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার নামে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তির কথা বলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মঙ্গলবার কৃষি মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সচিবের দপ্তরের আশপাশে সকাল থেকেই লোকজনের জটলা। অনেকেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁদের অধিকাংশের আলোচনায় সার ডিলার নিয়োগের বিষয়টি উঠে আসে।
এদিন নাটোরের লালপুরের সংরক্ষিত আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য সানজিদা ইয়াসমিন তুলি কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে কৃষি সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দুপুরে সচিবের দপ্তর থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে থাকা একজন জানান, নিজ এলাকার সার ডিলার নিয়োগের বিষয়েই তিনি সচিবের সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলেন।
এর কিছুক্ষণ পর বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমানও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সচিবের দপ্তর থেকে বের হন। তাঁরও আসার কারণ ছিল সার ডিলারশিপের বিষয়ে তদবির বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের করিডোরে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় রংপুর সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাসুদ রানার। তিনি জানান, তাঁর স্ত্রীর নামে সার ডিলারশিপের জন্য আবেদন করা হয়েছে। সেই আবেদন নিয়ে সচিবের সঙ্গে কথা বলতে তিনি মন্ত্রণালয়ে এসেছেন।
ভোলা সদরের ভোলা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কবীর মৃধাও সার ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেছেন। সার বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে ব্যবসা করা কবীর মৃধা জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স কবীর মৃধা। সচিবের দপ্তরের আশপাশে ঘোরাঘুরি করলেও সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়ায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।
অর্ধশতাধিক এমপির সাক্ষাৎ
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, গত রোববার থেকে চলতি সপ্তাহে অর্ধশতাধিক সংসদ সদস্য মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তাঁদের বড় একটি অংশের সাক্ষাতের উদ্দেশ্য ছিল নিজ নিজ এলাকার পছন্দের ব্যক্তিকে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া।
মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একজন সংসদ সদস্য তাঁর এলাকার একটি ইউনিয়নের ডিলার নিয়োগের জন্য তিনজনের নাম সুপারিশ করে পাঠিয়েছেন। পরে তালিকায় প্রথমে থাকা প্রার্থীকে বাদ দিয়ে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য ওই সংসদ সদস্য তদবির করছেন বলেও জানান তিনি।
এদিকে সার ডিলার নিয়োগের তালিকা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি প্রশাসন। তবে তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে বলে প্রশাসন ও বিএনপি নেতাদের কয়েকজনের কথায় জানা গেছে। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে সম্ভাব্য সার ডিলার হিসেবে কয়েকজনের নাম নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা প্রকাশ না করায় এসব নাম চূড়ান্ত কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পীরগাছার কান্দি ইউনিয়নের সম্ভাব্য ডিলার আতাউর রহমানকে ডিলারশিপ পাইয়ে দিতে ২৭ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার অভিযোগও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি অডিওতে অন্নদানগর ইউনিয়নের কীটনাশক ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন ও সার-কীটনাশক ব্যবসায়ী আবদুর রহিমের কথোপকথন শোনা যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের দুজনই ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেও তালিকায় স্থান না পাওয়ায় আক্ষেপ করেন বলে অডিওটির বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। অডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
যে প্রক্রিয়ায় নিয়োগ
কৃষি মন্ত্রণালয় গত ২৭ আগস্ট নতুন সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা প্রকাশ করে। নীতিমালা অনুযায়ী, প্রথমে আবেদনপত্র জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি যাচাই-বাছাই করবে। যাচাই শেষে দুই কার্যদিবসের মধ্যে আবেদনপত্র উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে পাঠানোর কথা।
উপজেলা কমিটি আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই করে বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য তিনজন যোগ্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করবে। এরপর উপজেলা কমিটির প্রস্তাবিত প্রার্থীদের তথ্য জেলা কমিটি পুনরায় যাচাই করবে। যাচাই শেষে প্রতি ইউনিয়নের তিনজন প্রার্থীর তালিকা সার ডিলার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠানো হবে।
কেন্দ্রীয় কমিটি আবেদনপত্র ও প্রার্থীদের তথ্য পরীক্ষা করে প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে একজনকে মনোনয়ন দেবে। এরপর সাত কার্যদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত ডিলার নিয়োগ অনুমোদনের কথা রয়েছে। অনুমোদনের পর জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করবে।
উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক (ডিসি)। ফলে মাঠপর্যায়ে আবেদন যাচাই-বাছাই ও প্রার্থী বাছাইয়ে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সচিবের বক্তব্য
এ বিষয়ে কৃষি সচিব সেলিম খান বলেন, ডিলারশিপের আবেদনগুলো উপজেলা ও জেলার মাধ্যমে এসেছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত মানদণ্ডের আলোকে বর্তমানে এসব আবেদন যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। বিভাগ ও জেলা অনুযায়ী কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা আবেদনগুলো যাচাই করছেন। চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে আরো কয়েক দিন সময় লাগবে।
লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার নামে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আসেনি।
সচিব আরো বলেন, নির্ধারিত মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে এবং সবচেয়ে যোগ্য আবেদনকারীকে নির্বাচিত করা হবে।
এদিকে সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে কৃষি সচিব সেলিম খানের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগের কথা সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক নেতা ও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সচিবের দপ্তরে দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে ডিলার নিয়োগের সুপারিশসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সচিবের দপ্তরে রাজনৈতিক নেতাদের এমন নিয়মিত যাতায়াত ও দীর্ঘ বৈঠক নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও নানা আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের
বিষয়টিও অনুসন্ধান করছেন সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকর্মীরা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে কৃষি সচিব সেলিম খানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি সরকারি নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছেন।