নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
প্রকাশ: ১৩:৩৭, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৩:৪০, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এদিকে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় দুই দফায় মোট ৮ দিনের রিমান্ড শেষে গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে শুনানি শেষে এ আদেশ দেওয়া হয়।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। তবে কোনো সদস্যকে দলীয়ভাবে বহিষ্কার করার বিষয়টি ওই অনুচ্ছেদে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণে শুধু বহিষ্কারের ভিত্তিতে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে কি না, তা নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, সংবিধান ও আইন অনুযায়ী গাজী নজরুল সংসদ সদস্য পদে থাকতে পারবেন না। কারণ নৈতিক স্খলনের অভিযোগে তার দল তাকে বহিষ্কার করেছে। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ কার্যকর হবে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি ১৯৯৬ সালের পার্লামেন্টে বিএনপির তৎকালীন সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিষয়টি উল্লেখ করেন। ব্যারিস্টার খোকন জানান, ফ্লোর ক্রসিংয়ের কারণে আখতারকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তখন আমি বিএনপির পক্ষে লড়েছিলাম। ওই মামলায় আখতার হেরে গিয়েছিলেন, অর্থাৎ তাকে সংসদ সদস্য পদ হারাতে হয়েছিল।
গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পর তাকে নিয়ে একটি পোস্ট করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। সেখানে তিনি লেখেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে আছে ‘পদত্যাগ’। তিনি (গাজী নজরুল ইসলাম) হয়েছেন ‘বহিষ্কার’। জামায়াত আজকেই নির্বাচন কমিশনকে জানিয়ে (তাকে বহিষ্কারের বিষয়ে) দিচ্ছে। কারণ ‘নৈতিকস্খলন’। প্রশ্ন হচ্ছে সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন কি না? আমার মতে না।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য যে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল থেকে পদত্যাগ করলে, দলীয় সিদ্ধান্তের বিপরীতে ভোট দিলে বা ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকলে কিংবা অনুচ্ছেদে উল্লেখিত অন্য কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তার সংসদ সদস্যপদ শূন্য হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ৭০ অনুচ্ছেদে দল কর্তৃক বহিষ্কার বা expulsion-কে সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে শুধু নৈতিক স্খলনের অভিযোগে কোনো সংসদ সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে তার সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে, সংবিধানের ভাষা থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তবে বহিষ্কারের পর তিনি যদি ৭০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত অন্য কোনো পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে।
অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসানের ভাষ্য, বিদ্যমান সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী শুধুমাত্র বহিষ্কার সংসদ সদস্যপদ শূন্য করার জন্য যথেষ্ট আইনগত ভিত্তি নয়। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় সদস্যপদ শূন্য হবে কি না, তা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। প্রয়োজনে বিষয়টি আদালতের বিচারিক পর্যালোচনারও আওতায় আসতে পারে।
যদি কোনো বিরোধ দেখা দেয় যে কোনো সংসদ সদস্য ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় তার আসন হারিয়েছেন কি না, তাহলে সংবিধানের ৬৬(৪) অনুযায়ী বিষয়টি নির্বাচন কমিশন নিষ্পত্তি করবে এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, এ ক্ষেত্রে ইসির সিদ্ধান্তই অ্যাবসলিউট নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দল বা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেন। আবার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হলে হাইকোর্টে রিট করতে পারেন। সেখানেও সমাধান না হলে আপিলেট ডিভিশনে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। গত ২৩ জুলাই নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছিলেন, শুধু দল থেকে বহিষ্কারের চিঠির ভিত্তিতে ইসির কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। স্পিকার বা সংসদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক রেফারেন্স পাওয়া গেলে বিষয়টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এরপর গত ২১ সেপ্টেম্বর ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে স্পিকারের কাছ থেকে নির্বাচন কমিশন কোনো চিঠি পায়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংসদ সচিবালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওই সময় পর্যন্ত গাজী নজরুল সংসদ সদস্য পদে বহাল ছিলেন।
গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মরদেহ গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গাজী নজরুলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর তার সংসদ সদস্য পদ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
এখন গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে মূল প্রশ্ন হচ্ছে, তার দলীয় বহিষ্কারকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় কীভাবে বিবেচনা করা হবে এবং স্পিকার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাবেন কি না। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী অবস্থান নির্ধারিত হবে।