আহছান উল্লাহ, কুমিল্লা (দক্ষিণ)
প্রকাশ: ১১:২১, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়াকে নাঙ্গলকোট উপজেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল মমিনকে উপজেলা যুবদলের এবং পৌর যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নুর আহমদকে পৌর যুবদলের সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করতে দেখা যায়।
এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় যুবদলের নির্বাহী কমিটি আবদুল মমিন ও নুর আহমদকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে বহিষ্কার করে। পেশিশক্তি প্রদর্শন, সংগঠনের সহযোদ্ধাকে অন্যায়ভাবে রক্তাক্ত করা এবং বিভিন্ন অনাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে এ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের প্রায় এক সপ্তাহ পর ১৮ সেপ্টেম্বর নাঙ্গলকোটের বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া। ওই সভার ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে তাকে বহিষ্কৃত দুই নেতাকে যথাক্রমে উপজেলা ও পৌর যুবদলের সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করতে দেখা যায়।
এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, কেন্দ্রীয় যুবদলের সিদ্ধান্তে বহিষ্কৃত দুই নেতাকে কীভাবে আবার সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর ঘোষণা দেওয়া হলো। তাদের মতে, যুবদলের কমিটি গঠন ও সাংগঠনিক পদ দেওয়ার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এমন ঘোষণা দেওয়া হলে তৃণমূলে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সদস্য সচিব ফরিদ উদ্দিন শিবলু বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগেই যুবদলের সব কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল। ওই বিলুপ্ত কমিটির দুই সদস্যকে কেন্দ্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। স্থানীয় এমপির বহিষ্কৃত দুই নেতাকে সভাপতি ঘোষণা দেওয়ার ভিডিও তিনি দেখেছেন বলেও জানান।
তিনি বলেন, ‘তারা বর্তমানে কোনো কমিটিতেই নেই।’
জেলা যুবদলের এই বক্তব্যে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে দেওয়া ঘোষণার সাংগঠনিক বৈপরীত্যের বিষয়টি সামনে এসেছে।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় যুবদলের বহিষ্কারাদেশের পর একই দুই নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে ঘোষণার ঘটনায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। তাদের অনেকেই মনে করছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত দলীয় শৃঙ্খলা, কেন্দ্র-তৃণমূল সমন্বয় এবং ভবিষ্যৎ কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
তৃণমূলের একাধিক নেতাকর্মী বলেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকা অবস্থায় বহিষ্কৃত নেতাদের নিয়ে প্রকাশ্যে নতুন পদ ঘোষণা করা হলে দলের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একই সঙ্গে এতে দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ আরও প্রকাশ্যে আসার আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে স্থানীয় বিএনপির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক লিখিত কোনো সিদ্ধান্ত বা বক্তব্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া বলেন, ‘তারা আমার সংগঠনের একনিষ্ঠ কর্মী। তারা দলের জন্য সব সময় কাজ করেছে। আমি তাদের এই বহিষ্কার মানি না। তাই তাদের সভাপতি ঘোষণা করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ক্লিয়ার করে দিয়েছি—যেখানে বহিষ্কার, সেখানেই আবিষ্কার।’
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নাঙ্গলকোটের ঢালুয়া হাইস্কুল গেট এলাকায় বিএনপি, ছাত্রদল ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি প্রতিবাদ মিছিলে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্যে আসে।
গত ১৩ আগস্টের ওই ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার কথা জানা যায়। আহত নেতাকর্মীদের অভিযোগ, হামলাকারীরা সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার অনুসারী। অন্যদিকে আহতরা স্থানীয়ভাবে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল গফুর ভূঁইয়ার অনুসারী হিসেবে পরিচিত বলে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ওই দিন ছাত্রদল নেতা মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে একটি মিছিলে আবদুল মমিন ও তার অনুসারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা করেন। এ ঘটনার পর কেন্দ্রীয় যুবদল আবদুল মমিন ও নুর আহমদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়।
কেন্দ্রীয় বহিষ্কারাদেশের পরও দুই নেতাকে নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যের এমন ঘোষণা নাঙ্গলকোটের বিএনপির রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার দাবি জানাচ্ছেন। অন্য একটি অংশ স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনপ্রতিনিধি ও তৃণমূলের নেতাদের ভূমিকার বিষয়টি সামনে আনছেন। ফলে বিষয়টি এখন নাঙ্গলকোট বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার কিংবা আবদুল মমিন ও নুর আহমদকে নতুন করে কোনো সাংগঠনিক পদ দেওয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় যুবদলের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।