নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
প্রকাশ: ২০:০০, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২০:০৮, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, দেশের সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মোট অনুমোদিত ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২টি পদের বিপরীতে ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জনবল কর্মরত রয়েছেন। হিসাব অনুযায়ী সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই সংখ্যা অনুমোদিত পদের প্রায় ২৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।
আজ বুধবার জাতীয় সংসদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকের জন্য তৈরি মন্ত্রণালয়ের এক নথিতে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যপত্রের সঙ্গে নথিটি দেওয়া হয় বলে সূত্রে জানা গেছে। এ সব পদে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
কমিটির সভাপতি সাঈদ আহমেদের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও অংশগ্রহণ করেন কমিটির সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান, শাহজাহান চৌধুরী, আমিরুল ইসলাম খান, ফখর উদ্দিন আহমেদ, রেহেনা আক্তার রানু ও নূরুল ইসলাম বুলবুল।
শূন্য পদ পূরণের পরিকল্পনা সম্পর্কে নথিতে বলা হয়েছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও এর অধীন দপ্তর-সংস্থা এবং মাঠপর্যায়ের প্রশাসনে শূন্য পদ পূরণে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুসারে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে ২ হাজার ৮৭৯টি শূন্য পদ পূরণের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২ হাজার ৬১টি পদ পূরণ করা হয়েছে।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও তাঁদের অধীন কার্যালয়গুলোতে অনুমোদিত পদ ৪১ হাজার ৭৫৫ টি। এর বিপরীতে কর্মরত জনবল ২৭ হাজার ১৭৭ জন এবং শূন্য পদ ১৪ হাজার ৫৭৮ টি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব জনবলের চিত্রেও শূন্য পদের তথ্য রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত ৬২৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৫০৫ জন। শূন্য রয়েছে ১২৪টি পদ।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধীন দপ্তর-সংস্থার জনবল কাঠামো হালনাগাদ করা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অন্যতম দায়িত্ব। নথিতে জনবল কাঠামো ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা হালনাগাদের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারী ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারের মাধ্যমে তথ্য সংরক্ষণ ও হালনাগাদের কার্যক্রমের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সরকারি চাকরির মোট শূন্য পদের কতটি কোন মন্ত্রণালয় বা বিভাগে রয়েছে, এসব পদ পূরণে কতজন নিয়োগ দেওয়া হবে এবং পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করার নির্দিষ্ট সময়সীমা কী—তা নথিতে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ নেই।
কমিটির সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, ‘যেগুলো শূন্য পদ আছে, সেগুলো দ্রুত পূরণের জন্য কথা বলেছি। কিছু উন্নয়নমূলক কাজ এবং বিভিন্ন সার্কিট হাউসের প্রকল্প ২০২৩ সালে শুরু হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো প্রকল্পের অগ্রগতি ১৫ শতাংশ, কোনোটি ৭ শতাংশ। এগুলো নিয়ে আমরা কথা বলেছি। এগুলো তো প্রধানমন্ত্রীর গতির সঙ্গে মিলছে না। সবাই যার যার মতো করে বলেছে।’
সূত্র জানায়, বৈঠকে সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া বিশেষ বিসিএস নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গ তোলেন জামায়াতের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল। তিনি বলেন, মেধাতালিকায় ১১৯ তম হয়েও শিবির-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে একজন প্রার্থীকে প্রথমে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়নি। কেন এবং কোন মানদণ্ডে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, তা জানতে চান তিনি। এ সময় প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি সংশ্লিষ্ট বিষয় বিবেচনার প্রক্রিয়া কমিটির বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়।
তবে আগামী বৈঠকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার কোনো সুপারিশ করেনি কমিটি বলে সূত্র জানায়।
শিবির-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কয়েকজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া এবং নির্বাচনে বিরোধী দল জয়ী হওয়ার পর বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) বদলি করার বিষয়েও কথা বলেন নূরুল ইসলাম বুলবুল।
কমিটির সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিসিএসে নিয়োগে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কী কী যাচাই-বাছাই করা হয় তা বৈঠকে জানতে চান জামায়াতের এমপি। তবে, জামায়াতের এমপির অভিযোগের ভিত্তি নেই বলে দাবি করেন ফখর উদ্দিন আহমেদ।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারের প্রবেশ পদে ৬১১ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত ৬৬৮ জনের মধ্যে ৫৭ জনের নাম ওই প্রজ্ঞাপনে ছিল না। তাঁদের মধ্যে তিনজন প্রয়োজনীয় সনদ জমা দেননি এবং আটজন স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উপস্থিত হননি বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এ নিয়ে বিতর্কের পর গত ৫ অক্টোবর ৪৬ জনের মধ্যে ৪০ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
এ ছাড়া জনপ্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারের কাজে অসহযোগিতাকারীদের শনাক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয় বলে সূত্রে জানা গেছে। সরকারি কাজে ক্ষতিকর ভূমিকা না থাকলে শুধু দলীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়া ঠিক হবে না বলেও আলোচনায় মত উঠে আসে। ওএসডি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও তাঁদের ভূমিকা ও অবস্থান বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেও বৈঠকে আলোচনা হয়।
সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে কমিটির সভাপতি বলেন, কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আইনগত, প্রশাসনিক বা বাস্তব কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা স্পষ্টভাবে কমিটির সামনে তুলে ধরতে হবে। কোনো বিষয় গোপন না করে প্রয়োজনীয় তথ্য, প্রাসঙ্গিক নথি ও বাস্তব পরিস্থিতি উপস্থাপন করতে হবে। অনিয়মের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
কমিটির সভাপতি সাঈদ আহমেদ বলেন, সমস্যা সমাধানে প্রচলিত ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কোনো দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নন। কমিটিকে প্রতিপক্ষ না ভেবে সবাইকে দেশ ও জনগণের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিভিন্ন জায়গা থেকে এলেও কমিটিতে সবার অভিন্ন পরিচয়—তাঁরা জনগণের প্রতিনিধি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন যেসব প্রকল্পের কার্যক্রমে ধীর গতি রয়েছে, সেগুলোর কারণ অনুসন্ধানের সুপারিশ করে কমিটি। একই সঙ্গে ‘সবার উপরে বাংলাদেশ’ নীতি বাস্তবায়নে সরকারের কার্যক্রমে অসহযোগিতা বা অবহেলাকারীদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।