বাংলাদেশে সাংবাদিকদের নিয়ে শঙ্কা জানালো সিপিজে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

প্রকাশ: ১৭:৪৫, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশে সাংবাদিকদের নিয়ে শঙ্কা জানালো সিপিজে

বাংলাদেশে প্রস্তাবিত Cyber Protection Act-এর সংশোধনী অবিলম্বে প্রত্যাহার অথবা ব্যাপকভাবে সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে সাংবাদিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন Committee to Protect Journalists (CPJ)।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে CPJ বলেছে, প্রস্তাবিত সংশোধনী কার্যকর হলে কর্মকর্তারা কোনো প্রতিবেদনকে ‘যাচাইহীন’ বা ‘অযাচাইকৃত’ মনে করলেই সেটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের কাজ বন্ধ করা এবং সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন বাতিলের মতো ক্ষমতাও কর্তৃপক্ষের হাতে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

CPJ-এর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বিধানটি সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কোনো তথ্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না থাকলেও সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে তা সংগ্রহ ও যাচাই করে প্রকাশ করতে পারেন—এমন মৌলিক সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে প্রস্তাবিত বিধানের সংঘাত তৈরি হতে পারে বলে সংগঠনটি মনে করছে।

‘অযাচাইকৃত’ প্রতিবেদনে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের আশঙ্কা

CPJ জানিয়েছে, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে অনলাইনে ‘গুজব’ ও ‘ভুল তথ্য’ ছড়ানোর বিরুদ্ধে নতুন ফৌজদারি বিধান যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় কোনো তথ্য বা প্রতিবেদনকে কর্তৃপক্ষ ‘অযাচাইকৃত’ হিসেবে বিবেচনা করলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের অপরাধের জন্য ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখার প্রস্তাব রয়েছে বলে CPJ জানিয়েছে।

সংগঠনটির মতে, কোনো সংবাদ বা তথ্যকে শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে ‘অযাচাইকৃত’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ রাখা হলে তা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য বিশেষ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সাংবাদিকের কাজ বন্ধ ও সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন বাতিলের ক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ

শুধু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নয়, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সংবাদমাধ্যমের ওপরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে CPJ জানিয়েছে।

কোনো সংবাদমাধ্যমকে আইনের আওতায় অপরাধী সাব্যস্ত করা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বা নিবন্ধন স্থগিত কিংবা বাতিলের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরির প্রস্তাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।

CPJ-এর মতে, সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ করা বা নিবন্ধন বাতিলের মতো ব্যবস্থা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

‘কর্তৃপক্ষ অনুমোদন না করলেও তথ্য প্রকাশের অধিকার থাকতে হবে’

CPJ-এর এশিয়া-প্যাসিফিক কর্মসূচির সমন্বয়কারী কুনাল মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের Cyber Protection Act-এর প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো এতটাই বিস্তৃত যে এগুলো গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তিনি বলেন, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে সংগৃহীত ও তথ্য-উপাত্ত দিয়ে যাচাই করা তথ্য প্রকাশ করতে সক্ষম হতে হবে—এমন তথ্যও, যা কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করেনি।

CPJ-এর বক্তব্য হলো, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব সাংবাদিকের; কিন্তু কোনো তথ্য সরকারের অনুমোদিত নয় বলেই সেটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ তৈরি হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

১০ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে পরামর্শ সভা

CPJ জানিয়েছে, প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় নির্বাচিত গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে একটি পরামর্শ সভা করেছে।

সংগঠনটি বাংলাদেশের সাইবার অপরাধসংক্রান্ত আইন অতীতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের ঘটনাগুলোর কথাও উল্লেখ করেছে।

CPJ-এর দাবি, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তৎকালীন সরকারের সময়ে Digital Security Act-এর আওতায় অন্তত ২৫৫ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল।

সংগঠনটির আশঙ্কা, ভুল তথ্য ও গুজব মোকাবিলার উদ্দেশ্যে প্রণীত নতুন বিধানও যাতে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে একই ধরনের চাপ বা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি না করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

সরকারের ব্যাখ্যা

অন্যদিকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালীব রহমান বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশৃঙ্খলা বন্ধ করা এবং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করাই প্রস্তাবিত সংশোধনীর উদ্দেশ্য।

অর্থাৎ সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত বিধানকে মূলত অনলাইনে গুজব, ভুল তথ্য ও সামাজিক অস্থিরতা মোকাবিলার উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

তবে CPJ-এর বক্তব্য অনুযায়ী, ভুল তথ্য মোকাবিলার নামে এমন কোনো বিধান করা উচিত নয়, যার ফলে স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশ করা সাংবাদিকরাও ফৌজদারি মামলার ঝুঁকিতে পড়েন।

সাংবাদিকতার জন্য বড় প্রশ্ন

প্রস্তাবিত সংশোধনী ঘিরে মূল প্রশ্নটি হলো—কোনো তথ্য সত্য না মিথ্যা, তা নির্ধারণের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে এবং ‘অযাচাইকৃত’ তথ্যের সংজ্ঞা কী হবে?

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় অনেক সময় সরকারি কোনো নথি বা বক্তব্য প্রকাশের আগেই সাংবাদিকরা বিভিন্ন স্বাধীন উৎস, নথি, প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। কোনো তথ্য প্রকাশের আগে সরকারি অনুমোদন বাধ্যতামূলক হয়ে গেলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

এ কারণে CPJ সরকারকে প্রস্তাবিত সংশোধনী অবিলম্বে প্রত্যাহার অথবা ব্যাপকভাবে সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে।

গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মতে, গুজব ও ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন থাকলেও সেই ব্যবস্থা যেন সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের অধিকারকে বাধাগ্রস্ত না করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

কারণ একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকের কাজ শুধু কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত তথ্য প্রকাশ করা নয়; বরং ক্ষমতাবান ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার কার্যক্রমও স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান করে জনগণের সামনে তুলে ধরা।

সেই স্বাধীনতার সীমা কোথায় এবং প্রস্তাবিত সাইবার আইনে সেই সীমারেখা কীভাবে নির্ধারিত হবে—এখন সেটিই বাংলাদেশের গণমাধ্যম অঙ্গনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন

শীর্ষ সংবাদ: