নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০০:৪৬, ২৩ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ০১:২৭, ২৩ আগস্ট ২০২৬
তথ্য বলছে, পুরো বিষয়টিকে শুধু “সম্পদের অভাব” দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
গ্যাসের মজুত আছে, কিন্তু উৎপাদন কমছে
বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য গ্যাস মজুত রয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের হিসাব নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মোট অবশিষ্ট মজুত প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে উৎপাদনের কারণে এই মজুত কমছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে—মাটির নিচে গ্যাস থাকা আর সেই গ্যাস প্রয়োজন অনুযায়ী উত্তোলন করতে পারা এক বিষয় নয়। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে এবং নতুন কূপ অনুসন্ধান ও খননের গতি প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় দেশীয় উৎপাদন চাপের মুখে পড়েছে।
ফলে বাংলাদেশকে ক্রমেই বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা LNG-এর ওপর।
চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ঘনফুট; বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ ছিল প্রায় ২.৬৫ বিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতি ছিল প্রায় ১.১৫ বিলিয়ন ঘনফুট।
এখানেই সংকটের মূল চিত্রটি স্পষ্ট হয়—সমস্যা শুধু মাটির নিচে গ্যাস আছে কি না, তা নয়; প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত গ্যাস উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন ও বিতরণ করা যাচ্ছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
LNG-নির্ভরতার ঝুঁকি কতটা?
বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ এখন LNG আমদানির মাধ্যমে আসে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে একটি LNG টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহে চাপ তৈরি হয়।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশকে চাপে ফেলেছে। কাতার থেকে LNG সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত LNG সংগ্রহ করতে হয়েছে।
অর্থাৎ একটি দেশ যখন তার জ্বালানি নিরাপত্তার বড় অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল করে ফেলে, তখন আন্তর্জাতিক যুদ্ধ, জাহাজ চলাচলের সংকট, দাম বৃদ্ধি কিংবা সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি দেশের মানুষের ওপর পড়ে।
বিদ্যুৎ সংকটের পেছনেও জ্বালানি ঘাটতি
বাংলাদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা থাকলেও সব কেন্দ্র সবসময় পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয় না। কারণ অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস, কয়লা বা তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
২০২৬ সালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে পাওয়ার গ্রিডের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬২টি ইউনিট জ্বালানি সংকটে ছিল। এর মধ্যে ২৬টি গ্যাসভিত্তিক, ৩৩টি তরল জ্বালানিভিত্তিক এবং দুটি কয়লাভিত্তিক ইউনিট ছিল।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেই বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা যায় না। বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় গ্যাস, কয়লা বা তেল পৌঁছানো না গেলে সেই সক্ষমতা কাগজেই থেকে যায়।
তাহলে কি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা নেই?
এখানেও বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন।
২০২৬ সালের মে মাসে সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা জানিয়েছিল, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত টানা এক সপ্তাহ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল এবং তখন কোনো লোডশেডিং হয়নি।
এটি দেখায়, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সবসময় উৎপাদনক্ষমতার ঘাটতিতে ভোগে—এমনটা বলা সঠিক নয়। বরং প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাওয়া, বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা অনেক সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তেলের ক্ষেত্রে বাস্তবতা আরও পরিষ্কার
গ্যাসের মতো বাংলাদেশের বড় পরিসরের নিজস্ব অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের ভিত্তি নেই। ফলে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের বড় অংশই আমদানি করতে হয়।
২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ অপরিশোধিত ও পরিশোধিত—দুই ধরনের জ্বালানি তেলই আমদানি করে।
আবার ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় আগের সময়ের তুলনায় ৮৫ শতাংশ বেড়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এর অন্যতম কারণ।
অর্থাৎ তেলের ক্ষেত্রে “দেশে পর্যাপ্ত মজুত আছে” বলা যাবে না। এখানে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আমদানিনির্ভরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ।
তাহলে সংকটের আসল কারণ কী?
সব তথ্য একসঙ্গে দেখলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে—
প্রথমত, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমছে।
দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনের তুলনায় নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন যথেষ্ট দ্রুত বাড়ছে না।
তৃতীয়ত, LNG আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আমদানি করা জ্বালানি অনিশ্চিত ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
পঞ্চমত, গ্যাস সরবরাহ কমলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়।
ষষ্ঠত, তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বড় ধরনের আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও সরবরাহের প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে পড়ে।
শেষ কথা
বাংলাদেশে গ্যাসের মজুত একেবারে নেই—এ কথা যেমন সত্য নয়, তেমনি “দেশে পর্যাপ্ত গ্যাস, তেল ও সব ধরনের জ্বালানি মজুত আছে”—এ দাবিও তথ্যসম্মত নয়।
বরং বাস্তব চিত্র হলো, বাংলাদেশের কিছু দেশীয় গ্যাসসম্পদ রয়েছে, কিন্তু উৎপাদন কমছে; বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু অনেক সময় জ্বালানির অভাবে কেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যায় না; আর জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে দেশটি ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর।
তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত শুধু “জ্বালানি কোথায়?” নয়—বরং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কেন যথেষ্ট বাড়ছে না, আমদানিনির্ভরতা কেন বাড়ছে, জ্বালানি মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর এবং সংকটের জন্য কার জবাবদিহিতা রয়েছে?
কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু গ্যাস বা তেল কেনার বিষয় নয়; এটি একটি দেশের অর্থনীতি, শিল্প, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।