আহমাদ ইশতিয়াক
প্রকাশ: ১৯:৩০, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৯:৩২, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি দাবিকে কেন্দ্র করে এ প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে ওই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কারণ এবং বাংলাদেশ দূতাবাসকে অবহিত করা হয়েছিল কি না, তা নির্ভরযোগ্য সূত্রে যাচাই করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের নির্যাতনের অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
২০১৮ ও ২০১৯ সালে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আসা বহু বাংলাদেশি নারী যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মূল লেখায় দাবি করা হয়েছে, ওই দুই বছরে সৌদি আরব থেকে ২ হাজার ৩১৫ জন বাংলাদেশি নারী দেশে ফিরেছেন। তাঁদের অধিকাংশই কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
২০১৯ সালের আগস্টে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরা ১১০ জন নারীকে নিয়ে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৩৮ জন একই সঙ্গে দুই ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। এ ছাড়া ৪৮ জন নিয়মিত বেতন না পাওয়ার অভিযোগ করেছিলেন।
মূল লেখায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪৭৩ জন বাংলাদেশি নারীর মরদেহ দেশে এসেছে। এর মধ্যে ১৭৫ জনের মরদেহ এসেছিল সৌদি আরব থেকে। অন্তত ৮১ জন নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর আত্মহত্যা করেছিলেন বলেও এতে দাবি করা হয়েছে। এসব পরিসংখ্যানের সুনির্দিষ্ট উৎস ও শ্রেণিবিন্যাস যাচাই করা প্রয়োজন।
আল জাজিরার ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে মূল লেখায় বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সৌদি আরবে অন্তত ৬৬ জন বাংলাদেশি নারীর মৃত্যু হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ৫২ জন আত্মহত্যা করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব মৃত্যুর সঙ্গে নির্যাতনের সম্পর্ক এবং প্রতিটি ঘটনার কারণ আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
২০১৯ সালে বিবিসির এক প্রতিবেদনে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরা বাংলাদেশি নারী আমেনা বেগমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছিল বলে মূল লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আমেনা বেগমের অভিযোগ ছিল, রিয়াদে প্রায় দেড় বছর অবস্থানকালে তাঁকে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে নিয়োগকর্তার যৌন প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছিল। একপর্যায়ে টানা তিন দিন খাবার না দেওয়ার পাশাপাশি মারধর করে তাঁর হাত ভেঙে দেওয়া হয় এবং তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।
আমেনা জানান, পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। চিকিৎসা দেওয়ার পর স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে তাঁকে আবারও ওই বাড়িতে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। সেখানে ফিরে যাওয়ার পরও তাঁর ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন অব্যাহত ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
আমেনার আরও অভিযোগ, এক বছর কাজ করলেও তিনি মাত্র দুই মাসের আংশিক বেতন পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে আবারও বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর পুলিশ তাঁকে হেফাজতে নেয়। পরে পুলিশের হেফাজত থেকেই তাঁর দেশে ফেরার ব্যবস্থা হয়।
মূল লেখায় বিবিসির প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে খুলনার সালমা বেগমের পরিবারের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। সালমার দাবি অনুযায়ী, সৌদি আরবে নির্যাতনের শিকার হয়ে তাঁর ছোট বোনের মৃত্যু হয়েছিল।
সালমার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বোন নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে নিয়োগকর্তার বাড়ি থেকে পালিয়ে থানায় গিয়েছিলেন। কিন্তু ওই পরিবার তাঁকে থানা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আবারও নির্যাতন করে বলে তাঁরা জানতে পেরেছিলেন। পরে তাঁর বোনের মৃত্যু হয়।
সালমার অভিযোগ, তাঁর বোনের মৃত্যু হয়েছিল ৪ মার্চ, কিন্তু মরদেহ দেশে পৌঁছায় পরবর্তী মাসের ২০ তারিখে। মৃত্যুসনদে হৃদ্রোগের কথা উল্লেখ থাকলেও মরদেহের মাথার পেছনে গুরুতর আঘাত ও শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
পরিবারটির অভিযোগ, তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাইতে পারেননি। তবে এ ঘটনায় তদন্ত বা বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য মূল লেখায় উল্লেখ নেই।
সৌদি আরবে নারী শ্রমিকদের নির্যাতনের অভিযোগগুলো সামনে আসার পর তাঁদের নিরাপত্তা, অভিযোগ জানানোর সুযোগ, যথাযথ তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একদিকে অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিষয়টি আলোচনায় আসে, অন্যদিকে নির্যাতনের শিকার নারী শ্রমিকদের অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচার কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে রয়েছে।
বিশেষ করে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নির্যাতনের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করা, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের নির্যাতন ও মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশকারীরা।
ছবি: সৌদি আরবে মেয়ের মরদেহ দেশে আনতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এক বাবা। মূল লেখায় ছবিটিকে সৌদি আরবে নির্যাতনের শিকার হয়ে মেয়ের মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ছবির পরিচয় ও ঘটনার বিবরণ প্রকাশের আগে যাচাই করা প্রয়োজন।