বিভাগীয় কমিশনার মনিরুজ্জামানের নির্দেশনায় বেড়েছে ভূৃমিসেবার গতি

সাদ্দাম হোসেন

প্রকাশ: ১৮:৫৮, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

বিভাগীয় কমিশনার মনিরুজ্জামানের নির্দেশনায় বেড়েছে ভূৃমিসেবার গতি

অতিসম্প্রতি ‎ভূমি প্রশাসনকে প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করার পাশাপাশি অনিয়ম ও গাফিলতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা ও এ সংক্রান্ত মাঠ প্রশাসনকে বিভিন্ন  নির্দেশনা দিয়েছিলেন  ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার মো: মনিরুজ্জামান মিঞা। গত ৬ আগস্ট গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন - ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। তাঁর এ বক্তব্যের পর মাঠপর্যায়ে ভূমি সেবার চিত্র কতটা বদলেছে, তা যাচাই করতে রাজধানী ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জ,  ফরিদপুর,টাঙ্গাইল,নরসিংদী জেলাসহ ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, অনলাইনে সেবা দেওয়ার কার্যক্রমে আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে গতি বেড়েছে, কিছুটা কমেছে ভোগান্তি। ভূমি সেবা প্রত্যাশীরাও জানিয়েছেন স্বস্তির কথা৷ কিন্ত এক্ষেত্রে আরও প্রচার ও জনসচেতনতা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ অজ্ঞতার কারণে এখনও ভূমিসেবাপ্রার্থীরা দ্বারস্থ হচ্ছেন দালালদের। 
‎
মূলত ‎ভূমি অফিসে বারবার যাওয়া, নামজারির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা কিংবা দালালের পেছনে ঘোরার ভোগান্তি কমাতে সম্প্রসারিত হয়েছে ডিজিটাল ভূমি সেবা। এখন ঘরে বসেই অনলাইনে নামজারির আবেদন, খতিয়ান সংগ্রহ ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করা যায়। আবেদনের অগ্রগতিও জানা সম্ভব অনলাইনে। তবে সেবা গ্রহণের পদ্ধতি সহজ হওয়ার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে আবেদন নিষ্পত্তি, অনিয়মের প্রতিকার এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
‎
‎রাজধানীর রমনা ভূমি অফিসে সরেজমিনে গিয়ে সেবাগ্রহীতাদের তেমন ভিড় দেখা যায়নি। অফিসটির বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনকে জানান, অনলাইনে আবেদনকারীদের দ্রুত সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কোনো আবেদন নিষ্পত্তি করা সম্ভব না হলে অনলাইনেই সংশ্লিষ্ট কারণ জানিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর মতে, অনলাইনে সেবা গ্রহণের সুযোগ বাড়ায় ভূমি অফিসে সরাসরি আসা মানুষের চাপ কমেছে।
‎
‎তবে একটি ভূমি অফিসে ভিড় কম থাকা মানেই সেবার মান বেড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন কয়েকজন সেবাগ্রহী। নামজারির আবেদন নিষ্পত্তিতে গড়ে কত দিন লাগছে, কতটি আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে এবং কী কারণে আবেদন আটকে থাকছে, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সেবাগ্রহীতাদের অভিজ্ঞতা, হয়রানির অভিযোগ এবং প্রতিকার পাওয়ার চিত্রও সামনে আনা জরুরি।
‎
‎ভূমি অফিসে অনিয়ম বা হয়রানির শিকার হলে প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিকেএমপি অনুবিভাগের যুগ্মসচিব ও সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ মফিজুল ইসলাম। দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনকে তিনি বলেন, কোনো ভূমি অফিসে সেবাগ্রহীতা অনিয়মের শিকার হলে কিংবা যথাযথ সেবা না পেলে অভিযোগ জানাতে পারেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অভিযোগ নিষ্পত্তিতে তিন কার্যদিবসের সময়সীমার কথা বলা হয়েছে।
‎
‎তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কতটি অভিযোগ নিষ্পত্তি হচ্ছে, কতটি অনিষ্পন্ন থাকছে এবং অভিযোগকারীরা কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পাচ্ছেন কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকলেও তা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেই চিত্র স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে তদন্ত ও নিষ্পত্তি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে সেবাগ্রহীতাদের আস্থা অর্জন কঠিন হবে।
‎
‎ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পের পরিচালক মো. পারভেজ হাসান বিপিএএ দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনকে বলেন, সেবা ডিজিটাল হওয়ায় কারচুপি বা অযথা দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে প্রশাসনিক ব্যস্ততার কারণে পরে বিস্তারিত জানাবেন বলে আশ্বাস দেন তিনি।
‎
‎ডিজিটাল ব্যবস্থায় অনিয়ম ও বিলম্বের সুযোগ কমার কথা বলা হলেও বাস্তবে এর সুফল কতটা মিলছে, তা যাচাইয়ের জন্য পরিমাপযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। আবেদন নিষ্পত্তির সময়, ঝুলে থাকা আবেদনের সংখ্যা, অভিযোগের ধরন এবং প্রতিকার পাওয়ার হার নিয়মিত প্রকাশ করা হলে সেবার মান সম্পর্কে নাগরিকেরা স্পষ্ট ধারণা পাবেন। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি এর কার্যকারিতা যাচাই এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
‎
‎বিভাগীয় কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান মিঞা গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ভূমি-সংক্রান্ত সেবাকে দ্রুত, সহজ ও হয়রানিমুক্ত করতে সরকার ধারাবাহিকভাবে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ করছে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
‎
‎তিনি বলেন, আগে নামজারি, খতিয়ান সংগ্রহ কিংবা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের মতো সাধারণ সেবা নিতে মানুষকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে দালালের সহায়তাও নিতে হতো। বর্তমানে অনলাইনে আবেদন, আবেদন যাচাই, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ ও আবেদনের অগ্রগতি জানার সুযোগ থাকায় ঘরে বসেই অনেক কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
‎
‎তবে শুধু ডিজিটাল সেবা চালু করাই সরকারের লক্ষ্য নয়, সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিভাগীয় কমিশনার। এ জন্য মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সেবার মান পর্যবেক্ষণ এবং তদারকির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
‎
‎মনিরুজ্জামান মিঞা বলেন, ‘ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের গাফিলতি সহ্য করা হবে না। জনগণের সেবা প্রদানে অবহেলা, অযথা বিলম্ব কিংবা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
‎
‎ভূমি অফিসে দালালনির্ভরতা কমানোর বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, অনলাইন সেবা চালুর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ অনেক কমে এসেছে। পাশাপাশি ভূমি অফিসগুলোতে অভিযোগ গ্রহণ, নির্ধারিত সময়ে আবেদন নিষ্পত্তি এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা রয়েছে। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি আরও কমানো সম্ভব হবে।
‎
‎তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল পদ্ধতিতে জমির তথ্য সংরক্ষণ ও যাচাই করা গেলে জাল দলিল, ভুয়া রেকর্ড এবং একই জমি নিয়ে একাধিক দাবির মতো অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হবে। নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
‎
‎ভূমি সেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন বিভাগীয় কমিশনার। তাঁর মতে, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কার্যকর তদারকি এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে সেবার মান আরও বাড়বে। ভূমি রেকর্ড, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর ও ডিজিটাল মানচিত্রের মতো সেবাকে সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগও এগিয়ে চলছে।
‎
‎সাধারণ মানুষের উদ্দেশে মনিরুজ্জামান মিঞা বলেন, ‘দালালের মাধ্যমে নয়, সরাসরি সরকারি পদ্ধতিতে কিংবা অনলাইনে ভূমি সেবা গ্রহণ করুন। কোনো ধরনের হয়রানি বা অনিয়মের শিকার হলে প্রশাসনকে জানান। আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব।’
‎
‎বিভাগীয় কমিশনারের কঠোর অবস্থানের ঘোষণা ভূমি প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রত্যাশা তৈরি করেছে। তবে সেই প্রত্যাশা বাস্তবে পূরণ হচ্ছে কি না, তা বোঝার জন্য মাঠপর্যায়ের সেবার অগ্রগতি নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন। অনলাইনে আবেদন ও কর পরিশোধের সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে আবেদন নিষ্পত্তি, অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার তথ্য প্রকাশ করা গেলে ডিজিটাল ভূমি সেবার কার্যকারিতা আরও স্পষ্ট হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন