সাদ্দাম হোসেন
প্রকাশ: ১৫:০৬, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পণ্য। খাদ্য ও পানীয় থেকে শুরু করে গৃহস্থালি সামগ্রী, প্লাস্টিক পণ্য, ইলেকট্রনিকস এবং হালকা প্রকৌশল—বহুমুখী উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের শিল্প ও বাণিজ্যে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে প্রতিষ্ঠানটি। আগামী দিনে দেশীয় বাজার সম্প্রসারণ, রপ্তানি বৃদ্ধি, নতুন পণ্য উৎপাদন, নির্মাণশিল্পে সরবরাহ বাড়ানো এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে গ্রুপটি। আগামী পাঁচ বছরে ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রায় ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক-বিপণন কামরুজ্জামান কামাল অগ্রযাত্রা প্রতিদিন কে জানান, ভোক্তাকেন্দ্রিকতা প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক সাফল্যের অন্যতম প্রধান কৌশল। ভোক্তার বাস্তব প্রয়োজন, দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত পণ্যের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েই পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করা হয়। তাঁর মতে, একটি পণ্যের সাফল্য শুধু বিক্রির পরিমাণ দিয়ে বিবেচনা করা যায় না; মানুষের জীবনে সেটি কতটা কাজে আসছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের যাত্রার শুরুর দিকে বিশুদ্ধ পানীয় জলের সংকট ও পানিবাহিত রোগ মোকাবিলার সামাজিক প্রয়োজন থেকেই টিউবওয়েল, গভীর নলকূপ ও পানির কল বাজারজাত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক দর্শন আরও সুস্পষ্ট হয়েছে—প্রতিটি পণ্য বা ব্র্যান্ডের মাধ্যমে মানুষের কোনো না কোনো সমস্যার সমাধান করা।
কামরুজ্জামান কামালের ভাষ্য, সময়ের সঙ্গে ভোক্তার রুচি, পছন্দ ও চাহিদা পরিবর্তিত হচ্ছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক পণ্য বাজারে আনা, পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং দেশ-বিদেশে বিপণন ও ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভোক্তার আস্থা ধরে রাখাকেই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থান, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট, খাদ্যাভ্যাস এবং ভোক্তার চাহিদা বিবেচনা করে বাজার নির্বাচন করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির পণ্যসম্ভারের বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশের বাজারে প্রবেশ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
কামরুজ্জামান কামাল জানান, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং অন্যান্য অঞ্চলের বাজারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভারতের পাশাপাশি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, কুয়েত, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের মতো বাজারেও ব্যবসা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
রপ্তানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শুধু নতুন দেশে প্রবেশ করাই লক্ষ্য নয়; সংশ্লিষ্ট দেশের স্থানীয় বাজারে পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো এবং বিদ্যমান বাজারে বিক্রির পরিমাণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যবসায় দেশীয় ও রপ্তানি বাজারের অনুপাত প্রায় ৭০:৩০। আগামী দিনে এ অনুপাত ৬৫:৩৫-এ উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। অর্থাৎ, মোট উৎপাদনের তুলনায় রপ্তানির অংশ বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্যের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চায় গ্রুপটি।
নির্মাণশিল্পে পাইপ, নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে এ খাতেও ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। যদিও প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি রড ও সিমেন্ট উৎপাদন করে না, তবে নির্মাণশিল্পের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে এ খাতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে।
কামরুজ্জামান কামাল জানান, নির্মাণ খাতের জন্য পিভিসি পাইপ, ইউপিভিসি পাইপ, ইলেকট্রিক্যাল কেবল, ফিটিংস, সুইচগিয়ার, বোর্ড, টাইলস, নির্মাণসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণ এবং স্টিল স্ট্রাকচারসহ নানা পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক কাঠামোর বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত কিছু পণ্যও এ খাতে গুরুত্ব পাচ্ছে।
তিনি বলেন, আগে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো—এমন অনেক পণ্য এখন দেশে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং দেশের ভেতরেই শিল্পের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে।
তাঁর মতে, নির্মাণশিল্পে দেশীয় পণ্যের ব্যবহার বাড়লে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের বিকাশ ত্বরান্বিত হবে।
ভোক্তার পরিবর্তিত চাহিদা এবং বাজারের নতুন সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে আগামী দিনে পণ্যের তালিকা আরও সম্প্রসারণ করতে চায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য, ইলেকট্রনিকস ও ইলেকট্রিক্যাল ডিভাইস এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কামরুজ্জামান কামাল বলেন, নতুন পণ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোক্তার প্রয়োজন, বাজারের সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক কার্যকারিতা বিবেচনা করা হয়। প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে শুধু নতুনত্ব নয়, বরং মানুষের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহারকে যুক্ত করার সুযোগও দেখা হচ্ছে।
পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের অংশ হিসেবে টেকসই ব্যবস্থাপনা, কৃষিতে ব্যবহৃত উপকরণের পুনর্ব্যবহার, প্লাস্টিক রিসাইক্লিং এবং বিকল্প উপকরণ নিয়ে কাজ করার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাঁর মতে, টেকসই উৎপাদন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী পাঁচ বছরে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রধান লক্ষ্য ব্যবসার পরিসর বাড়ানো, উৎপাদন সক্ষমতা উন্নত করা এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে নতুন কারখানা স্থাপন, বিদ্যমান কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন শ্রেণির পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
কামরুজ্জামান কামাল জানান, আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যবসা সম্প্রসারণের সঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে যুক্ত করে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
তিনি বলেন, উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন বাজার সৃষ্টি, দেশীয় পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণ—এই উদ্যোগগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সুযোগও তৈরি হবে।
তাঁর মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান আরও বাড়াতে উৎপাদন বৃদ্ধি, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আমদানি বিকল্প পণ্য তৈরি এবং বহুমুখী পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্য সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।