ভাসমান হাটে পেয়ারার ঘ্রাণ, আটঘর-কুড়িয়ানায় পর্যটকদের সমাগম

‎​মো. ফরিদ আহমেদ, নেছারাবাদ (পিরোজপুর)

প্রকাশ: ১০:৫৭, ২৫ জুলাই ২০২৬

ভাসমান হাটে পেয়ারার ঘ্রাণ, আটঘর-কুড়িয়ানায় পর্যটকদের সমাগম

‎​খাল জুড়ে সারি সারি নৌকা, আর প্রতিটিতে সাজানো তাজা সবুজ-হলুদ পেয়ারা। দূর থেকে দেখলে মনে হয় খালের বুকে যেন সবুজ-হলুদের ক্যানভাস ভেসে চলেছে। পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানায় এখন চলছে পেয়ারার ভরা মৌসুম। এ সময়ে সন্ধ্যা নদীর শাখা আটঘর কুড়িয়ানা খালে নৌকায় চলে পেয়ারার বিকিকিনি। দেশের একমাত্র ভাসমান পেয়ারা বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ জনপদে এখন প্রতিদিনই পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়।

‎প্রতি বছর জুলাই-আগস্ট মাসে এই অঞ্চলে পেয়ারা ও আমড়ার মৌসুম শুরু হয়। প্রতিদিন খুব ভোর থেকেই আটঘর, কুড়িয়ানা এবং পিরোজপুর-ঝালকাঠির সীমানাবর্তী ভীমরুলীর ভাসমান হাটে জমে ওঠে কেনাবেচা। ​কৃষকরা তাদের ছোট ছোট নৌকায় বাগান থেকে সদ্য তোলা পেয়ারা নিয়ে হাজির হন এই হাটে। 
‎
‎ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা পর্যটকরা ট্রলার বা ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে পেয়ারা বাগানের মাঝ দিয়ে পরিবার- পরিজনসহ ঘুরে ঘুরে উপভোগ করেন খালের বুকজুড়ে জমে ওঠা এই ভাসমান বাণিজ্য। এবং সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কিনেন টাটকা পেয়ারা। 
‎
‎স্থানীয় কৃষক সুভাষ মন্ডল বলেন, 'প্রচুর পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে, পাশাপাশি এখন পর্যটকদের কারণে আয়ও বেড়েছে দ্বিগুণ। অনেকে নৌকা, হোটেল, গাইডিং সার্ভিস দিয়ে রোজগার করছেন। পেয়ারা বাগানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট হোটেল, খাবার দোকান। ফলে একদিকে যেমন কৃষকরা পাচ্ছেন ন্যায্যমূল্য, অন্যদিকে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে স্থানীয়দের জন্য।'
‎
‎ঢাকার আদাবর থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক ফজলুল হক বলেন, ​'প্রতি বছর বর্ষায় ভাসমান হাটের এই দৃশ্য দেখতে আমরা বন্ধুরা মিলে চলে আসি। খালের শান্ত জলে নৌকায় ঘুরে পেয়ারা বাগান দেখা এবং সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে সতেজ পেয়ারা কেনার অনুভূতি এক কথায় অসাধারণ। এমন ঐতিহ্যবাহী জায়গা আরও যত্ন নিয়ে রক্ষা করা দরকার।'
‎
‎একই অভিমত বরগুনা থেকে আসা কলেজ শিক্ষার্থী স্বপন আহমেদেরও । তিনি বলেন, বন্ধুদের নিয়ে এসেছি। এখানে এসে অনেক কিছু জানার ও দেখার সুযোগ হয়েছে। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি পেয়ারা কেনা, নৌকা ভ্রমণ সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটা দারুণ।
‎
‎​​পেয়ারা মৌসুমকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্দীপনা। ভাসমান বাজারে পেয়ারা বেচাকেনার পাশাপাশি পর্যটনশিল্প স্থানীয় মানুষের উপার্জনের বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। পর্যটকদের খাল ও বাগান ঘুরিয়ে দেখাতে স্থানীয় শত শত নৌকা ও ট্রলার চালকের ব্যস্ততার পাশাপাশি আয় বেড়েছে। এছাড়াও কুড়িয়ানা বাজারের বিখ্যাত মিষ্টির দোকানগুলো এবং স্থানীয় খাবার হোটেলগুলোতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে।
‎​
‎​পর্যটকদের আগমন বাড়ায় খালের সরু নৌপথে যাতে যানজট বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও নৌ-পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নেছারাবাদ উপজেলা প্রশাসন থেকে ইতোমধ্যে পেয়ারা বাগান ভ্রমণে পর্যটকদের জন্য ৮ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় জনগণের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ বজায় রাখা, বাগান এলাকায় কোনো ধরনের লাউড স্পিকার, সাউন্ড সিস্টেম বা উচ্চ শব্দ সৃষ্টি না করার পাশাপাশি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব বয়সী পর্যটকদের শালীনতা বজায় রেখে চলাফেরা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অনুমতি ব্যতিত বাগানে প্রবেশ, পেয়ারা, আমড়া বা গাছের পাতা ছেঁড়া এবং যত্রতত্র নৌযান ভিড়ানোও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
‎
‎নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত দত্ত বলেন, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ভাসমান পেয়ারা বাজার এখন পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নৌকা চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। ‎তিনি আরও জানান, এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারিভাবে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা চাই, এই স্থানটি শুধু পেয়ারা উৎপাদনের জন্য নয়, দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও দেশ-বিদেশে পরিচিত হোক। 

আরও পড়ুন