মামুন অর রশিদ বিজন, মেহেরপুর:
প্রকাশ: ১১:৪২, ৩ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১১:৫৯, ৩ মার্চ ২০২৬
সোমবার বেলা ১২টার দিকে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল চিৎলা পাটবীজ খামার পরিদর্শন করেন। দলটির নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ সুগার ক্রপ গবেষণা ইন্সটিটিউট-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নুরে আলম। সঙ্গে ছিলেন ড. আনিসুর রহমান ও ড. শামসুল আরেফিন।
পরিদর্শন শেষে ড. নুরে আলম জানান, রেড পাম উইভিল প্রথম সৌদি আরবে খেজুর গাছে শনাক্ত হলেও সময়ের সঙ্গে এটি দেশীয় তাল ও নারিকেল গাছেও আক্রমণ শুরু করেছে। শক্ত কাণ্ডের কারণে আগে দেশীয় তালগাছে এ পোকা আক্রমণ করতে পারত না। তবে পরিবেশ ও অভিযোজনের ফলে এখন তা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রথম এ ধরনের আক্রমণ শনাক্ত হয় রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায়। দ্বিতীয়বারের মতো এবার মেহেরপুরের গাংনীর চিৎলা ফার্মে এর উপস্থিতি নিশ্চিত হলো।
বৃক্ষপ্রেমী ওয়াসিম সাজ্জাদ লিখন জানান, পরিবেশ রক্ষায় স্ব-প্রণোদিত হয়ে তিনি এলাকায় তালবীজসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করেছেন। আশপাশের গাছগুলো তিনি নিজেই নিয়মিত পরিচর্যা করেন। কয়েক মাস আগে দু-একটি তালগাছের পাতা ও মাইজপাতা শুকিয়ে যেতে দেখা যায়। পরে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় তিন শতাধিক তালগাছ মারা যায়। আক্রান্ত গাছের কাণ্ড ও গোড়ায় কালো ও সাদা রঙের পোকা দেখা যায়। গাছের ভেতরের অংশ ঝুরঝুরে ময়দার মতো হয়ে যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে গাছ শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। বিষয়টি তিনি কৃষি অফিস, বন বিভাগ ও স্থানীয় সাংবাদিকদের অবহিত করেন।
গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমান জানান, স্থানীয় সাংবাদিক মামুন অর রশিদ বিজন ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহীন আলমের মাধ্যমে তালগাছ মারা যাওয়ার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। মারা যাওয়া কয়েকটি গাছ চিরে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন যে এটি রেড পাম উইভিলের আক্রমণ।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সনজীবন মৃধা বলেন, চিৎলা ফার্মে তালের বাগানে পোকার আক্রমণে খবর অবগত হওয়ার সাথে সাথে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি পরিদর্শন করে এবং প্রাথমিকভাবে রেড পাম উইভিল সনাক্ত করা হয় এবং সে মোতাবেক পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি এই পোকাটি নতুনভাবে সনাক্ত হওয়ায় আমরা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট ও বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক বরাবর চিঠি প্রদান করি এবং ১ দিনের ব্যবধানে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে।
উউচ্চতর গবেষণা টিমে বাংলাদেশ সুগার ক্রপ গবেষণা ইন্সটিটিউট এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নুরে আলমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সরেজমিন পরিদর্শন করেন। দলটি আক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান করে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, রেড পাম উইভিল সাধারণত গাছের কাণ্ডের ক্ষতস্থান বা ফাটলে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বের হওয়া লার্ভা কাণ্ডের ভেতরে প্রবেশ করে নরম অংশ খেতে থাকে। এতে গাছ ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে পড়ে এবং একসময় হঠাৎ ভেঙে যায় বা শুকিয়ে মারা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় বাহ্যিক লক্ষণ স্পষ্ট না হওয়ায় দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন।
প্রতিরোধে ফেরোমোন ট্র্যাপ স্থাপন, উপযুক্ত কীটনাশক প্রয়োগ, আক্রান্ত অংশ পরিষ্কার করে কপার পেস্ট ব্যবহার এবং গাছের কচি পাতা অযথা না কাটার পরামর্শ দেন গবেষণা দল।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সঞ্জীব মৃধা, চিৎলা পাটবীজ খামারের যুগ্ম পরিচালক মোর্শেদুল আলম এবং গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমান।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সাল থেকে সামাজিক বনায়নের আওতায় চিৎলাসহ গাংনী উপজেলায় প্রায় তিন লক্ষাধিক তালবীজ রোপণ করা হয়। বর্তমানে গাছগুলোর বয়স ৪ থেকে ৭ বছর। সম্প্রতি শতাধিক গাছ হঠাৎ শুকিয়ে পড়ায় এলাকায় গুঞ্জন সৃষ্টি হলেও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে রেড পাম উইভিলের আক্রমণই প্রকৃত কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আক্রান্ত গাছ রক্ষা ও পোকার বিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।