চৌদ্দগ্রামে নিখোঁজ ২ ছাত্রী কক্সবাজারের হোটেলে

মোঃআহছান উল্লাহ,কুমিল্লা 

প্রকাশ: ১৯:৫২, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চৌদ্দগ্রামে নিখোঁজ ২ ছাত্রী কক্সবাজারের হোটেলে

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কাশিনগর এলাকার দুই মাদ্রাসাছাত্রীর রহস্যজনক নিখোঁজ এবং দীর্ঘ ছয় দিন পর কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেল থেকে উদ্ধার হওয়ার ঘটনাটি দেশের চাইল্ড সাইকোলজি (কিশোর মনস্তত্ত্ব) ও বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। পুলিশ এটিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পরিবারের ওপর অভিমান বলে গণমাধ্যমকে জানালেও, ঘটনার নেপথ্যে উঠে এসেছে একাধিক অপ্রকাশিত চাঞ্চল্যকর তথ্য।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কাশিনগর এলাকার আল-আমিন মহিলা মাদ্রাসার দুই শিক্ষার্থী—১২ বছর বয়সী মাহিমা ইসলাম মাহি (পিতা: মহিন উদ্দিন, গ্রাম: বসন্তপুর/জুগিরকান্দি) এবং ১৪ বছর বয়সী তানিসা আক্তার (পিতা: জাহাঙ্গীর আলম)—প্রতিদিনের মতোই বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। কিন্তু তারা মাদ্রাসায় পৌঁছায়নি। বিকেল গড়িয়ে রাত হলেও তারা যখন বাড়ি ফেরেনি, তখন পরিবারের পক্ষ থেকে চৌদ্দগ্রাম থানায় পৃথক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।

কুমিল্লার পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় চৌদ্দগ্রাম মডেল থানা ও জেলা ডিবি পুলিশের যৌথ টিম এই উদ্ধার অভিযানে নামে। পুলিশ প্রথম ২-৩ দিন তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করেও তাদের সঠিক লোকেশন শনাক্ত করতে বেগ পাচ্ছিল, কারণ তারা বারবার নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করছিল। পরবর্তীতে আধুনিক নেটওয়ার্ক ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে জানা যায়, কিশোরী দুটি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পর্যটন নগরী কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত এলাকায় অবস্থান করছে।

অবশেষে কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সহায়তায় সৈকত সংলগ্ন ‘গ্রীণ প্যারাডাইজ’ হোটেলের ১০১ নম্বর কক্ষে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে দুই কিশোরীকে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

কোনো অভিভাবক ছাড়া, মাত্র ১২ ও ১৪ বছর বয়সী দুটি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে কীভাবে এবং কার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ব্যবহার করে কক্সবাজারের মতো একটি ব্যস্ত পর্যটন এলাকার হোটেলের কক্ষ ভাড়া পেল? পর্যটন নীতি অনুযায়ী অভিভাবক ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্কদের রুম দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, উদ্ধার অভিযান শেষে হোটেল কর্তৃপক্ষের এই গাফিলতি বা নিয়মের ব্যত্যয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।


পুলিশের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে স্রেফ স্বেচ্ছায় ঘর ছাড়া এবং পরিবারের ওপর অভিমান বলা হলেও, স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্র বলছে ভিন্ন কথা। কুমিল্লা থেকে কোনো প্রকার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া সরাসরি কক্সবাজারে গিয়ে হোটেল বুকিং করা এবং সেখানে আত্মগোপনে থাকার পেছনে কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের (যেমন টিকটক, ইমো বা ফেসবুক) যোগাযোগ কিংবা কোনো তৃতীয় পক্ষের প্ররোচনা ছিল কি না—তা নিয়ে গভীর তদন্ত চলছে। কারণ, বর্তমান যুগে কিশোর-কিশোরীদের একাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল জগতের হাতছানিতে ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।


মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই বয়সে সামান্য পারিবারিক শাসন বা বকাঝকাকে কিশোর-কিশোরীরা বড় আঘাত হিসেবে ধরে নেয়। এই দুই ছাত্রীর ক্ষেত্রেও পারিবারিক কোনো শাসন বা প্রত্যাশার চাপ থেকে তীব্র মানসিক অভিমান তৈরি হয়েছিল, যা তাদের এত বড় একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।


উদ্ধার হওয়া দুই ছাত্রীকে ইতিমধ্যেই কুমিল্লায় নিয়ে আসা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আইনি ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। তবে হস্তান্তরের পাশাপাশি কিশোরী দুটির ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় তাদের মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সমাজকর্মীরা।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন